গর্ভপাতের পর পুনরায় গর্ভধারণের চেষ্টা করার সঠিক সময় কখন


সন্তান প্রতিটি বাবা মায়ের কাছেই যেন এক স্বপ্নের নাম। সন্তান ধারণের সুসংবাদ তাই অনেক আনন্দ বয়ে নিয়ে আসে বাবা মায়ের মনে। একটি গর্ভপাত সেই স্বপ্ন আর আনন্দকে ধূলিস্যাৎ করে দেয়। সাথে নিয়ে আসে দুঃখ, চরম হতাশা আর আত্মগ্লানি। ফলে অনেকসময় একবার গর্ভপাতের পর দ্বিতীয়বার সন্তান গ্রহণের চেষ্টা করতে অনেক দম্পতি ভয় পান।

ছবিসূত্র: Pregnancy – LoveToKnow

গর্ভধারণের প্রথম ট্রাইমস্টারে অর্থাৎ প্রথম ৩ মাস বা ১২ সপ্তাহের মধ্যে গর্ভপাতের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। গর্ভধারণের প্রথম ২ সপ্তাহে গর্ভপাতের সম্ভাবনা থাকে প্রায় ৭৫%। ৩য় থেকে ৬ষ্ঠ সপ্তাহে প্রায় ১০% এবং ৭ম থেকে ১২ তম সপ্তাহে প্রায় ৫% সম্ভাবনা থাকে। এমনকি অনেকে আছেন যারা গর্ভধারণ করেছেন কিনা বোঝার আগেই গর্ভপাতের শিকার হন।

গর্ভপাত প্রতিটি মায়ের জন্যই অত্যন্ত দুঃখজনক, বিশেষ করে যে দম্পতি অনেকদিন ধরে সন্তান নেয়ার চেষ্টা করছেন তাদের জন্য। এই দুঃখ ও হতাশা কাটিয়ে ওঠার জন্য আবার সন্তান গ্রহণের চেষ্টা করার কোনো বিকল্প নেই। আগে ডাক্তাররা একবার গর্ভপাতের পর পরবর্তী সন্তান নেবার আগে কমপক্ষে ৩ মাস অপেক্ষা করতে বলতেন। কারণ ধারণা করা হতো যে, পুনরায় গর্ভধারণের জন্য প্রস্তুত হতে মায়ের শরীরের জন্য কিছুটা সময় প্রয়োজন।

কিন্তু সম্প্রতি এ বিষয়ে গবেষণায় নতুন কিছু তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, গর্ভপাতের পর যত দ্রুত সম্ভব পুনরায় গর্ভধারণের চেষ্টা করা উচিত। কারণ গবেষণার ফলাফলে দেখা গিয়েছে যে, যেসকল দম্পতি প্রথম ৩ মাস অপেক্ষা করেন তাদের থেকে যারা গর্ভপাতের পর প্রথম ৩ মাসের মধ্যেই পুনরায় বাচ্চা নেবার চেষ্টা করে থাকেন তারা জীবিত সন্তান জন্মদানে ৭১% বেশি সফল হয়ে থাকেন। ‘অবস্টেট্রিক্স ও গাইনোকোলোজি’ নামক জার্নালে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, যেসকল নারী এই সময়ের মধ্যে গর্ভধারণের চেষ্টা করেন, তাদের ক্ষেত্রে পরবর্তী সন্তান জীবিত থাকার হার শতকরা ৫৩ ভাগ হয়ে থাকে।

ছবিসূত্র: Onlymyhealth

গবেষকরা প্রায় ১,০০০ জন মহিলার উপর গবেষণা করেছেন যারা তাদের গর্ভধারণের প্রথম ৩ মাসের মধ্যেই ১ বার বা ২ বার গর্ভপাত করেছেন। এই মহিলাদেরকে তাদের পরবর্তী  ৬টি ঋতুচক্র পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে এবং এই সময়ের মধ্যে যারা গর্ভবতী হয়েছেন তাদেরকে তাদের সন্তান জন্মগ্রহণ পর্যন্ত সর্বক্ষণ পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল। গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, প্রায় অর্ধেকেরও বেশি সংখ্যক মহিলা পরবর্তী সন্তান জীবিত অবস্থায় জন্মদানে সক্ষম হয়েছিল। আরও জানা গিয়েছে, যেসকল মহিলাদের অন্যান্য শারীরিক জটিলতা নেই তাদের ক্ষেত্রে প্রথম সন্তানের গর্ভপাত হলেও গর্ভপাতের পরবর্তী ৩ মাসের মধ্যে গর্ভধারণ ক্ষমতা বেশি থাকে।

এই গবেষণার একজন সিনিয়রর সম্পাদক হলেন এনরিক সিস্টারমেন (Enrique Schisterman, Ph.D)। এনরিক আমেরিকার ম্যারিল্যান্ড স্টেটের NIH এর ইউনাইস কেনেডি শ্রীভার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ চাইল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন এন্ড হিউম্যান ডেভলপমেন্ট নামক প্রতিষ্ঠানের এপিডেমিওলজি শাখার প্রধান। তিনি বলেন, ”যেসকল মহিলাদের প্রথম গর্ভপাত কোনো শারীরিক জটিলতার কারণে হয়নি, আমাদের সংগৃহিত তথ্য অনুযায়ী সেসকল মহিলাদের ক্ষেত্রে পরবর্তী সন্তান গ্রহণে দেরি করার কোনো কারণ নেই।”

তবে যেসকল মহিলাদের গর্ভাবস্থায় অন্যান্য শারীরিক জটিলতা হয়েছে যেমন, টিউবাল প্রেগন্যান্সি ( এক্ষেত্রে ভ্রূণ মায়ের ইউটেরাসে না থেকে ইউটেরাসের বাইরে থাকে) অথবা ইউটেরাসে অস্বাভাবিক ভ্রূণীয় টিস্যুর বৃদ্ধি ইত্যাদি ক্ষেত্রে এই গবেষণা কার্যকর হয়নি। এই ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।

ছবিসূত্রঃ CNN.com

তবে একথাও সত্য যে, এই গবেষণার ক্ষেত্রে গবেষকরা কেবল গর্ভপাত হওয়া নারীর শারীরিক ব্যাপারটিই লক্ষ্য করেছেন, মানসিক দিকটি নয়; অর্থাৎ গর্ভপাত হওয়ার পর সেই নারী হয়তো শারীরিকভাবে খুব দ্রুত আবার পরবর্তী গর্ভধারণের জন্য প্রস্তুত হতে পারেন কিন্তু মানসিকভাবে প্রস্তুত না থাকলে তিনি পরবর্তী গর্ভধারণে সফল হবেন কিনা তা এই গবেষণায় উল্লেখ করা হয়নি।

একই গবেষণার আরেকজন গবেষক হলেন ক্যারেন সিল্ফ (Karen Schliep) মনে করেন, যদিও তারা শারীরিক ভাবে গর্ভপাত হওয়া দম্পতির পুনরায় গর্ভধারণে দেরি করার কোনো যথাযথ কারণ খুঁজে পাননি, তবুও মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে তাদের সময় লাগতে পারে। আবার তাদের গবেষণায় তারা এটাও খুঁজে পেয়েছেন যে, গর্ভপাত হওয়া দম্পতি যদি দ্রুত পুনরায় বাচ্চা নেয়ার চেষ্টা করেন এবং অবশেষে জীবিত সন্তান জন্মদানে সফল হন তবে তাদের সন্তান হারানোর যন্ত্রণা থেকেও তারা দ্রুত মুক্তি পান।

ছবিসূত্রঃ tech doctor

এ ব্যাপারে মত প্রকাশ করেছেন মিশেল স্যান্টোস (Michele Santos Alignay) নামক একজন রেজিস্টার্ড ফ্যামিলি কাউন্সিলর। উল্লেখ্য তার নিজেরও গর্ভপাত হয়েছিল। তিনি মনে করেন যে গর্ভপাতের পর আবার সন্তান গ্রহণে তাড়াহুড়া না করাই ভালো। কারণ সন্তান হারানোর যন্ত্রণা সত্যিই কঠোর এবং বাস্তব যা থেকে সহজে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। তাই এই অনুভূতি থেকে পালিয়ে না বেড়িয়ে একে গ্রহণ করতে হবে এবং কিভাবে এই অবস্থাকে মন থেকে মেনে নেয়া যায় সেই উপায় খুঁজতে হবে।

তিনি আরো বলেন, হাতের কাজ করা বা বাগান করা ইত্যাদি শৌখিন কাজের মধ্যে ব্যস্ত থেকে পুনরায় নিজের আনন্দকে খুঁজে নিতে হবে এবং নিজের দুঃখকে ধীরে ধীরে বিদায় জানাতে হবে। এভাবে আগে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে হবে। এরপর যখন মানসিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে তখনই পুনরায় সন্তান নেবার চেষ্টা করাই হবে উত্তম পন্থা। তা না হলে মানসিক হতাশার কারণে পুনরায় সন্তান ধরণের চেষ্টা ব্যর্থ হতে পারে।

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

More From: গর্ভবতী মায়ের যত্ন

DON'T MISS