গর্ভপাতের কারণ, লক্ষণ ও প্রতিরোধের কয়েকটি উপায়


মাতৃত্ব প্রতিটি নারীর জীবনে আনে পূর্ণতা। তাই সন্তান ধারণের সুসংবাদ প্রতিটি নারীর জীবনে আনে অনাবিল আনন্দ। একটি গর্ভপাতে কেবল একটি শিশুর মৃত্যু হয় না, ধ্বংস হয় মায়ের হাজার স্বপ্ন। তাই গর্ভধারণের শুরু থেকেই মা ও তার পরিবারের সকলের জেনে রাখা উচিত গর্ভপাতের কারণ, লক্ষণ ও প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে। তাহলেই অযাচিত গর্ভপাত এড়ানো সম্ভব হবে।

ছবিসূত্রঃ Daily Star

গর্ভপাত কী?

মায়ের গর্ভে কোনো ভ্রূণের বয়স ২০ সপ্তাহ হবার আগেই অর্থাৎ পরিণত হবার আগেই যদি এটি কো্নো কারণে বিনষ্ট হয় তবে একে গর্ভপাত বলা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই গর্ভপাত ঘটে গর্ভের প্রথম ট্রাইমস্টার বা ১২ সপ্তাহের মধ্যে। এমনকি অনেক নারী গর্ভধারণ করেছেন কিনা তা বোঝার আগেই গর্ভপাতের শিকার হন।

গর্ভপাত কেন হয়?

জেনে রাখা প্রয়োজন গর্ভপাত সাধারণ কোনো কারণে যেমন ব্যায়াম করলে, মানসিক চাপে বা সামান্য শারীরিক অস্বস্তি ইত্যাদি কারণে হয় না। অধিকাংশ গর্ভপাতের কারণ হল ক্রোমজোমাল এবনরমালিটি বা অস্বাভাবিকতা। আর এর কারণ হলো মিলনের সময় অপরিণত ডিম্বাণু বা ধ্বংস প্রাপ্ত শুক্রাণু। এছাড়াও মায়ের নানা ধরণের শারীরিক ত্রুটির কারণে হতে পারে।

ছবিসূত্রঃ wiseGEEK
  • গর্ভাবস্থায় যদি মায়ের প্রচণ্ড জ্বর হয়, জ্বরের মাত্রা যদি ১০২ ডিগ্রির ওপরে হয়, তবে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে গর্ভপাত হতে পারে। তাই মায়ের জ্বর হলে সাথে সাথে নাপা বা প্যারাসিটামল খেতে হবে, মাথায় পানি দিতে হবে, প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী সাপোজিটোর দিতে হবে।
  •  গর্ভাবস্থায় যদি মায়ের রক্তচাপ অনেক বেড়ে যায় তবে ভ্রূণেরও রক্তচাপ বেড়ে গিয়ে গর্ভপাত হতে পারে। তাই কিছুদিন পর পর মায়ের রক্তচাপ পরীক্ষা করা জরুরী। উচ্চ রক্তচাপ থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খেতে হবে এবং সবসময় রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
  • গর্ভবতী মায়ের যদি আগে থেকেই ডায়াবেটিস থেকে থাকে এবং তা যদি অনিয়ন্ত্রিত থাকে তবে অনেক সময় গর্ভপাত হতে পারে। অনেক সময় গর্ভধারণের পরও মায়ের ডায়াবেটিস হতে পারে। তাই গর্ভধারণের পর রক্তপরীক্ষা করে ডায়াবেটিস আছে কিনা জানতে হবে এবং তা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ বা ইনসুলিন গ্রহণ করতে হবে।
  • গর্ভবতী মায়ের যদি কিডনির রোগ নেফ্রোটিক সিন্ড্রোম থেকে থাকে তবে গর্ভপাত হতে পারে। গর্ভধারণের আগেই এই রোগ থেকে থাকলে গর্ভধারণের পর ডাক্তারকে পূর্ব রোগের ইতিহাস সম্পর্কে জানাতে হবে এবং ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলতে হবে।
  • গর্ভাবস্থায় যদি মা হাম বা কলেরা রোগে আক্রান্ত হন তবে এর জীবাণুর কারণে গর্ভপাত হতে পারে।
  • মায়ের যৌনাঙ্গ বা জরায়ুতে গঠনগত ত্রুটি যেমন জরায়ু দুর্বল বা জরায়ুর মুখ বড় হলে এটি বাচ্চা ধরে রাখতে পারেন না। এছাড়া কিছু বিনাইন টিউমারের কারণে গর্ভস্থ শিশু ঠিকমত বড় হতে পারে না। তখন গর্ভপাত হয়। আবার পূর্বের গর্ভধারণের বেলায় ইচ্ছাকৃত ভাবে গর্ভপাত ঘটালে পরেও গর্ভপাতের সম্ভাবনা থাকে।
  • গর্ভধারণের পর প্লাসেন্টা বা গর্ভের অমরা যদি অনেক নিচে নেমে আসে তখন গর্ভপাত হতে পারে। এরকম হলে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।
  • গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীরে প্রোজেস্টেরন হরমোন কম উৎপন্ন হলে গর্ভপাত হতে পারে।
  • গর্ভাবস্থায় মা যদি প্রচন্ড মানসিক দুশ্চিন্তা বা কষ্টে থাকেন তখন ভ্রূণের হৃদস্পন্দনের ভারসাম্যহীনতার কারণে গর্ভপাত হতে পারে। তাই মা যেন সবসময় ভাল চিন্তা করেন ও মানসিক কষ্টে না থাকেন সেদিকে পরিবারের সকলের খেয়াল রাখা প্রয়োজন।
  • গর্ভাবস্থায় পড়ে গিয়ে পেটে প্রচন্ড আঘাত পেলে কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণের কারণে গর্ভপাত হতে পারে। তাই গর্ভাবস্থায় খুব সাবধানে চলাফেরা করতে হয় ও একদম প্রয়োজন ছাড়া ভ্রমণ করতে নিষেধ করা হয়।

গর্ভপাতের লক্ষণ

ছবিসূত্রঃ ShrewdMommy

গর্ভধারণের পর অস্বাভাবিক রক্তস্রাব গর্ভপাতের প্রধান লক্ষণ। তবে ইমপ্লেমেন্টেশনের সময় ভ্রূণ যখন ফ্যালোপিয়ান টিউব থেকে ইউটেরাসে স্থাপিত হয় তখনও সামান্য পরিমানে হালকা গোলাপি বা বাদামি রঙের স্রাব হতে পারে, এটি গর্ভপাত নয়। গর্ভপাতের সময় রক্তপাতের পরিমাণ সাধারণ পিরিয়ড বা ঋতুস্রাবের চেয়ে বেশি হয়। তলপেটে ব্যথাও হতে পারে। অনেক সময় রক্তের সাথে মাংসল চাকার মতো বের হতে পারে।

গর্ভপাত হলে চিকিৎসা

গর্ভপাতের হলে প্রথম করণীয় হলো রক্তক্ষরণ বন্ধ করা এবং গর্ভপাত পরবর্তী ইনফেকশন প্রতিরোধ করা। যদি গর্ভধারণের প্রাথমিক পর্যায়ে গর্ভপাত হয় তবে গর্ভের সমস্ত ফেটাল টিস্যু এমনিতেই বের হয়ে যায়। কিন্তু ভ্রূণ ও প্লাসেন্টার সকল অংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বের হয়ে না গেলে অপারেশন করে বের করে ফেলতে হবে। তবে অপারেশনের পরও রক্তস্রাব পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। কোনো কারণে রক্তস্রাবের পরিমাণ বেড়ে গেলে কিংবা জ্বর এলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

ছবিসূত্রঃ National Post

গর্ভপাতের ফলে মায়ের শরীর থেকে প্রচুর আয়রন ও ফলিক এসিড বের হয়ে যায়। ফলে মায়ের শরীর দুর্বল হয়ে যায়। এজন্য ওষুধের পাশাপাশি মাকে প্রচুর পরিমানে আয়রণযুক্ত খাবার খেতে হবে। এছাড়াও ওজন স্বাভাবিক রাখার জন্য খাবারের একটি আদর্শ রুটিন মেনে চলতে হবে। সাথে হালকা ব্যায়াম করা যেতে পারে।

গর্ভপাত প্রতিরোধের উপায়

গর্ভাবস্থার প্রথম ৩ মাস ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এসময় যেকোনো মাকে একটু সাবধানে থাকতে হবে। ভারী কাজ করা ও সহবাস থেকে বিরত থাকতে হবে। পূর্বে কোনো রোগের ইতিহাস থাকলে ডাক্তারকে জানাতে হবে। প্রয়োজন ছাড়া দীর্ঘ ভ্রমণ করা যাবে না। প্রচুর পানি পান করতে হবে। সর্বোপরি ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হবে।

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

More From: Uncategorized

DON'T MISS