প্রসবের আগে যে বিষয়গুলো সম্পর্কে আপনার জেনে রাখা প্রয়োজন


যদি আপনি হাসপাতালে আপনার অনাগত সন্তানকে জন্ম দিতে চান তবে এটি নিয়ে আপনার অনেক কিছু ভাববার আছে। পুরো গর্ভাবস্থায় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আপনি যত বেশি জানার চেষ্টা করবেন, যেকোনো প্রয়োজনে আপনি তত বেশি দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। নিম্নে হাসপাতালে শিশু জন্মদান সংক্রান্ত কিছু বিষয় বা নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত দেয়া হলো।

ছবিসূত্রঃ Kurdistan TV

ইন্ডাকশনের মাধ্যমে প্রসব বেদনা তোলার সিদ্ধান্ত

ইন্ডাকশন হলো কৃত্রিমভাবে ওষুধ বা ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রসব বেদনা ওঠানোর পদ্ধতি। সাধারণত প্রাকৃতিকভাবে প্রসব বেদনা ওঠার আগে বাচ্চা প্রসব করাতে হলে কিংবা নির্দিষ্ট তারিখের পরেও প্রসব বেদনা না উঠলে এই পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়। অনেকসময় দেখা যায় যে স্বাভাবিক প্রসব বেদনার জন্য অপেক্ষা করা মা বা শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। কিংবা অনেকসময় ৪২ সপ্তাহ পার হওয়ার পর ও প্রসব বেদনা উঠছেনা অথবা শিশুর নড়াচড়া আশংকাজনক হরে কমে গিয়েছে। সেসব ক্ষেত্রে ডাক্তাররাই ইন্ডাকশন পদ্ধতিতে লেবার পেইন বা প্রসব বেদনা ওঠানোর ব্যবস্থা করে থাকেন।

ছবিসূত্রঃ Daily Mail

তবে অনেকসময় রোগী বা রোগীর আত্মীয়স্বজনদের ভীতির কারণে তাদের ইচ্ছানুযায়ী ইন্ডাকশন পদ্ধতি গ্রহণ করা হয় যদিও চিকিৎসাগত দিক থেকে তার কোনো প্রয়োজন হয় না। সম্প্রতি পাওয়া তথ্যানুযায়ী এর হার প্রায় শতকরা ২৫ ভাগ। জেনে রাখা ভালো ইন্ডাকশনেরও অনেক ঝুঁকি রয়েছে। যেমন: পর্যাপ্ত সময়ের আগেই নবজাতকের জন্ম, নবজাতকের পর্যাপ্ত প্রস্তুতির আগেই ডেলিভারির ব্যবস্থা করায় নবজাতকের যেকোনো ক্ষতি হবার আশংকা, কিংবা অবশেষে সিজার ইত্যাদি ।

ঝুঁকি এড়ানোর জন্য সিজার বা সি-সেকশন পদ্ধতি গ্রহণ

সিজার বা সি সেকশন পদ্ধতি হল মায়ের তলপেটে অপারেশনের মাধ্যমে শিশুকে বের করে আনার পদ্ধতি। কোনো কারণে শিশুর অবস্থান ব্রিচ পজিশনে বা উলটো থাকলে বা প্রসবের সময় মা অজ্ঞান হলে বা খিঁচুনি উঠলে সিজার করানো হয়। সাধারণত উন্নত দেশগুলোতে মেডিক্যাল ইমারজেন্সি ছাড়া সিজার করানোর কোন নিয়ম নেই। তবে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন এ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী প্রস্তাবিত সিজারের হার শতকরা ১২-১৫ ভাগ হলেও অনেক দেশেই সিজারের সংখ্যা প্রস্তাবিত মানের দ্বিগুণ বা তারও বেশি এবং দিন দিন এ সংখ্যা বেড়েই চলেছে।

ছবিসূত্রঃ Dolphin MPS

অনেকেই মা ও শিশুর জন্য সিজারই নিরাপদ মনে করেন। কিন্তু বাস্তবিক অর্থেই নরমাল ডেলিভারি বা ভ্যাজাইনাল বার্থই সবচেয়ে বেশি নিরাপদ। সিজারেও অনেক ঝুঁকি রয়েছে। একবার সিজার হলে পরবর্তীতেও সিজার করার প্রয়োজন হতে পারে। অনেকের কোমর ব্যাথাসহ অনেক জটিলতাও দেখা দেয়।

দ্বিতীয়বার সিজার করানোর সিদ্ধান্ত

অনেক দেশে চিকিৎসকেরা রোগীর একবার সিজার হলে পরবর্তী বাচ্চাও সিজারে জন্মদানের সিদ্ধান্ত দেন। কিন্তু এটাই প্রমাণিত যে একবার সিজার হলেও পরবর্তী বাচ্চা জন্মদানের সময় নরমাল ডেলিভারি বা ভ্যাজাইনাল বার্থই (VBAC) বেশি নিরাপদ। নরমাল ডেলিভারি হলে মায়ের সুস্থ হতে বেশি সময়ের প্রয়োজন হয় না। আবার নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে হওয়া বাচ্চারও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সিজার করা বাচ্চার চেয়ে বেশি হয়। শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়ার মতো রোগগুলো সিজার করা বাচ্চাদের বেশি হয়ে থাকে। যেসব মহিলাদের একবার সিজার করার পরেও পরবর্তী বাচ্চা নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে হয়েছে তারা আগের চেয়ে বেশি সুস্থ ও সবল অনুভব করে থাকেন।

ভ্যাজাইনা বা যোনী পরীক্ষা

এটি একটি সাধারণ প্রক্রিয়া। ধাত্রী বা হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত সেবিকাগন নির্দিষ্ট সময় পর পর মায়ের ভ্যাজিনা পর্যবেক্ষণ করে দেখে থাকেন যে সার্ভিক্স পর্যাপ্ত প্রসারিত হয়েছে কিনা। তবে একথাও সত্য যে যোনী যত পরীক্ষা করা হয় তত এতে ইনফেকশন হবার আশংকা বাড়ে। কিন্তু এই পরীক্ষা থেকে এটা বোঝা যায় না যে, কত দ্রুত বাচ্চা বের হতে পারবে। তাই অনেক সময় রোগীরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন যে তিনি কতবার ভ্যাজিনা পরীক্ষা করবেন কিংবা আদৌ করবেন কিনা।

ইলেক্ট্রনিক ফেটাল মনিটরিং (EFM)

ছবিসূত্রঃ The New Republic

অনেকসময় হাসপাতালে ভর্তি হবার সাথে সাথেই মায়ের পেটের সাথে ইলেক্ট্রনিক তার বা লোব এর সাহায্যে একটি মনিটর জুড়ে দেয়া হয় শিশুর পজিশন, নড়াচড়া, হার্টবিট ইত্যাদি পর্যবেক্ষণের জন্য। যদি এই পরীক্ষা নির্দিষ্ট সময় পর পর করা হয় তবে কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু অনবরত এটি করতে থাকা মানে মায়ের ওঠা বসা ও যাতাকলে অসুবিধা হওয়া ও প্রসবের সময় মায়ের কষ্ট বেড়ে যাওয়া যা থেকে শিশুর শরীরে কম অক্সিজেন পৌঁছানো ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিতে পারে। যার ফলে ভ্যাকুয়াম বা সিজার পদ্ধতি গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে।

এপিডুরাল এনেসথেশিয়া

ছবিসূত্রঃ Medical News Today

এপিডুরাল এনেসথেশিয়া ধমনীর ভিতর প্রবেশ করে ব্যাথাকে প্রশমিত করে দেয় ফলে মা কোনো ব্যাথা অনুভব করেন না। সিজারের ক্ষেত্রে এটি অবশ্যই প্রয়োজন কিন্তু সাধারণ প্রসবের ক্ষেত্রে এটি গ্রহণ না করে উত্তম। এটি গ্রহণ করলে প্রসবের অসহনীয় যন্ত্রনা অনুভব হয়না বলে অনেকে একে নিরাপদ মনে করলেও এটিরও রয়েছে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া। সাধারণ প্রসবের সময় এটি গ্রহণ করলে অনেকসময় মা পর্যাপ্ত চাপ প্রয়োগ করতে পারেন না। ফলে প্রসবে সময় বেশি লাগে। অনেকসময় সিজার করার প্রয়োজনও হতে পারে। তাছাড়া এটির পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া হিসেবে কোমর ব্যাথসহ অনেক সমস্যাও পরবর্তীতে দেখা দিতে পারে।

কৃত্রিমভাবে ঝিল্লি বিদারিত করা

অনেক সময় প্রসবে বেশি সময় লাগলে হাসপাতালের সেবিকা বা ধাত্রী নিজেরাই টিউবের মাধ্যমে ঝিল্লি বিদারিত করে পানি বের করে দেন। এতে প্রসব ত্বরান্বিত হয়। তবে অনেকসময় এর কারণে ইনফেকশন, কর্ডের স্থানচ্যুতি ইত্যাদিও দেখা দিতে পারে।

প্রতিটি পদ্ধতিরই রয়েছে কিছু সুবিধা আবার কিছু ঝুঁকি। পরিস্থিতি বিবেচনা করে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেই ঝুঁকিমুক্তভাবে একটি সুস্থ শিশুর জন্ম দেয়া সম্ভব হবে।

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

More From: গর্ভবতী মায়ের যত্ন

DON'T MISS