গর্ভাবস্থায় জ্বর কতটুকু ঝুঁকিপূর্ণ ও এতে করণীয় কী?


জ্বর খুব সাধারণ অসুখ হলেও গর্ভাবস্থায় এটি মারাত্মক রূপ নিতে পারে। কারণ শরীরের অতিরিক্ত তাপমাত্রা গর্ভস্থ শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এমনকি এতে যেকোনো বয়সের ভ্রূণ নষ্ট ও হয়ে যেতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হলো খুব সাধারণ কারণেও গর্ভবতী মায়ের জ্বর এসে যেতে পারে। তাই জ্বর আসা মাত্রই তাপমাত্রা কমানোর চেষ্টা করা ও কোনো অবস্থাতেই যেন তাপমাত্রা আর বাড়তে না পারে সেদিকে সচেতন থাকা অত্যন্ত জরুরি।

ছবিসূত্রঃ HealthTap

কী কী কারণে গর্ভাবস্থায় জ্বর আসতে পারে?

যখন শরীরে কোনো প্রকার ইনফেকশন দেখা দেয় এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সেই ইনফেকশনের বিরুদ্ধে কাজ করতে শুরু করে তখন সাধারণত শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। সাধারণত শরীরের তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট হলে জ্বর ধরে নেয়া হয়। গর্ভাবস্থায়ও মায়ের শরীরের ইনফেকশন দেখা দিলে সেটি যেন কোনোভাবে মা ও শিশুর কোনো ক্ষতি করতে না পারে সেজন্যে মায়ের ইমিউন সিস্টেম এর বিরুদ্ধে কাজ শুরু করে দেয়। যার ফলাফল জ্বর। আর গর্ভাবস্থায় মায়ের ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হয়ে যায় বলে খুব সহজেই যে কোনো অসুখ বা ইনফেকশনের কবলে পড়তে পারেন তাই জ্বর আসাটাও অত্যন্ত সাধারণ ব্যাপার। তাই বিভিন্ন রোগ বালাইয়ের থেকে সতর্ক থাকাটা জরুরি।

ইউরিনারি ইনফেকশন

গর্ভাবস্থায় ইউরিন ইনফেকশন খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। মায়ের শরীরে নানা রকম হরমোন উৎপন্ন হওয়ায় মায়ের ইউরিনারি ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হয়ে পরে যার কারণে ইউরিনারি ব্ল্যাডার খুব সহজেই ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হয়। ফলাফল ব্যাথা, জ্বালা পোড়া ও আরো মারাত্মক অবস্থা হলে জ্বর। এমতাবস্থায় কেবল জ্বরের ওষুধ খেলে জ্বর কমবে না। বরং দ্রুত ইউরিন ইনফেকশনের চিকিৎসা করতে হবে যেন তা কিডনি পর্যন্ত ছড়িয়ে আরও জটিল রূপ ধারণ করতে না পারে।

ঠাণ্ডাজনিত সমস্যা

ছবিসূত্রঃ Pregnancy & Newborn Magazine

মায়ের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে এ সময়ে খুব সহজেই মায়েরা ঠান্ডায় আক্রান্ত হয়ে পড়েন। খুব অল্পতেই নাক বন্ধ হওয়া এমনকি সাইনাসের সমস্যা হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। এছাড়াও এলার্জি ও ইনফ্লুয়েঞ্জা জনিত ঠান্ডা থেকেও জ্বর আসতে পারে।

গ্যাস্ট্রো-ইনটেস্টাইনাল ইস্যু

পাকস্থলী ও ক্ষুদ্রান্ত্র জনিত নানা সমস্যা যেমন আলসার, ইনফেকশন ইত্যাদি থেকে হতে পারে বমি ও ডায়রিয়ার মতো সমস্যা যা পরবর্তীতে পানিশূন্যতা ও জ্বর ডেকে আনতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপ

উচ্চ রক্তচাপ মায়ের প্রিকল্যাম্পসিয়া ও জ্বরে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি বাড়ায়।

ফুড পয়জনিং

ছবিসূত্রঃ Healthline

অনেক সময় ফুড পয়জনিং বা ডায়রিয়া থেকেও জ্বর আসতে পারে।

এছাড়াও মায়ের নিউমোনিয়া, টন্সিল ইনফেকশন ইত্যাদি থাকলে জ্বর হবার সম্ভাবনা থাকে।

ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণের সময় মাকে জ্বর ছাড়াও অন্যান্য উপসর্গগুলো সম্পর্কেও জানাতে হবে। অনেকসময় জ্বরের পাশাপাশি মায়ের প্রচন্ড কোমর ব্যাথা, ঘন ঘন শ্বাস ফেলা, শরীর শির শির করা, পেট ব্যথা, মাথা ও মুখমন্ডল ব্যাথা, বমি, ঘাড় ব্যাথা ইত্যাদি থাকত পারে। প্রতিটি লক্ষণ সম্পর্কে ডাক্তারকে জানালে তার পক্ষে রোগ নির্ণয় ও সঠিক ওষুধ বাছাই করতে সুবিধা হবেl

জ্বর গর্ভস্থ শিশুর উপর কী কী প্রভাব ফেলতে পারে?

গর্ভাবস্থায় জ্বর অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কারণ এটি গর্ভস্থ শিশুর উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।কোন কারণে হালকা জ্বর গর্ভস্থ শিশুর উপর তেমন প্রভাব ফেলে না। তবে দীর্ঘদিন ধরে জ্বর থাকলে বা ১০০ ফারেনহাইট বা তার বেশি জ্বর হলে তা অবশ্যই চিন্তার কারণ। বিশেষ করে ১ম ট্রাইমিস্টারে জ্বর হলে ভ্রূণের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হয় যা পরবর্তীতে যে কোনো ঝুঁকি ডেকে আনতে পারে। আর ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি জ্বর হলে তা শিশুর বিভিন্ন জন্মগত ত্রূটির উদ্ভব ঘটাতে পারে। যেমন:

প্রিম্যাচিউর বেবি বার্থ

জ্বর হলে মায়ের পানিশূন্যতা ও পুষ্টিহীনতার আশংকা থাকে। আর এর ফলে গর্ভস্থ শিশুরও অকালেই জন্মগ্রহণ করার আশংকা থাকে যা পরবর্তীতে শিশু-মৃত্যু সহ নানা রোগ জটিলতা ডেকে আনতে পারে।

কম ওজনের শিশু জন্মদান

ঘন ঘন জ্বর গর্ভস্থ শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে বাধা দেয়। ফলে জন্মের সময় শিশুর ওজন কম হতে পারে।

গর্ভপাত

প্রথম ট্রাইমিস্টারে মায়ের ঘন ঘন বা মারাত্মক জ্বর হলে তা গর্ভপাতের কারণ হতে পারে।

জন্মগত ত্রূটি

গর্ভাবস্থায় জ্বর হলে তা শিশুর জন্মগত ত্রূটিরও কারণ হতে পারে। যেমন: স্পাইনা বিফিডা- গর্ভাবস্থায় যদি ভ্রূণ শিশুর মেরুদন্ড ও মেরুরজ্জ যথাযথভাবে বিকশিত না হয় তবে একে বলা হয় স্পাইনা বিফিডা। জ্বরের কারণে পুষ্টি শিশুর কাছে পৌছায়না বলে ফলিক এসিডের অভাবে এ রোগ হয়ে থাকে।

ক্লেফট প্যালেট বা তালু কাটা ও ক্লেফট লিপ বা ঠোঁট কাটা

ছবিসূত্রঃ Deutsche Cleft Kinderhilfe eV

এটি হলো যখন জন্মগত ভাবে শিশুর তালু জোড়া লাগানো থাকে না। মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় পুষ্টির অভাব হলে শিশুর ঠোঁট ও তালুর টিস্যু অনেক সময় ঠিকমতো তালু ও ঠোঁট জোড়া লাগাতে পারেনা।

হার্ট ডিফেক্ট

জন্মগত ভাবেই অনেক শিশুর হার্টে ফুটো সহ নানা রকম ত্রূটি দেখা দিতে পারে।

জ্বর কমানোর জন্য কী করা যেতে পারে?

ছবিসূত্রঃ Doctor Raman Mehrzad MD

জ্বর আসা মাত্রই মাথায় পানি দিতে হবে ও সারা শরীর মুছতে হবে যেন শরীরের তাপমাত্রা বাড়তে না পারে। এছাড়াও প্রচুর পানি পান করতে হবে ও প্রচুর তরল খাবার যেমন স্যুপ, লেবুর শরবত, ডাবের পানি ইত্যাদি খেতে হবে যা শরীরের তাপমাত্রা বাড়া প্রতিরোধ করবে। প্রচুর বিশ্রাম নিতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ মতো প্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন করতে হবে।

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

More From: গর্ভবতী মায়ের যত্ন

DON'T MISS