সিজারিয়ান ডেলিভারির পর মাকে যে নিয়মগুলো মেনে চলতে হবে


সন্তান জন্মদান সত্যিই একটি আনন্দঘন মুহূর্ত। দীর্ঘ ৯ মাস অপেক্ষার পর গর্ভের সন্তানকে দেখতে পাওয়া আর স্পর্শ করতে পারার আনন্দ অতুলনীয়।

মায়ের দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ন্ত্রিত শরীর ধীরে ধীরে আগের রূপে ফিরে যায়। কিন্তু যদি সিজারিয়ান ডেলিভারি হয়, তবে মায়ের ভোগান্তিও যেমন বাড়ে, তেমন শরীর আগের অবস্থায় ফিরে যেতেও কিছুটা সময় লাগে। এখানে কিছু টিপস নিয়ে আলোচনা করা হল, যা মেনে চললে মায়ের দ্রুত সুস্থতা অর্জন সম্ভব হবে।

ছবিসূত্রঃ fuersie.de

১. পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন

সিজার একটি বড় ধরনের সার্জারি। অন্য সার্জারির মতো এতেও শরীর সুস্থ হতে সময় লাগে। সার্জারির পর সাধারণত প্রায় ৩-৫ দিন জটিলতা দেখা দিলে, আরও কিছুদিন হাসপাতালে থাকার প্রয়োজন হতে পারে। এরপর অন্তত ৬ সপ্তাহ সময় প্রয়োজন শরীর সুস্থ হতে। এ সময়টুকুতে মায়ের প্রচুর বিশ্রাম প্রয়োজন। যদিও ছোট সন্তানকে সময় দিতে গিয়ে মায়ের পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেয়া সত্যিই কঠিন হয়ে পড়ে।

যখন ছোট শিশুটি অল্প সময়ের জন্য হলেও ঘুমাবে, তখন মাকেও একটু বিশ্রাম নিয়ে নিতে হবে। প্রয়োজনে বাড়িতে আত্মীয় বা সহকারীর সাহায্য নেয়া যেতে পারে, যিনি শিশুর ও বাড়ির কাজে এসময়ে মাকে সাহায্য করবেন, যেন মা একটু বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ পান।

ছবিসূত্রঃ sleepingshouldbeeasy.com

২. নিজের শরীরের যত্ন নিন

এসময়ে শুধু সন্তানের নয়, নিজের শরীরের দিকেও খেয়াল রাখতে হবে মাকে। এসময় সিঁড়ি দিয়ে চলাফেরা যত কম করা যায় ততই ভাল। এমনকি শিশুটির চেয়ে ভারি কিছু তোলা কখনই উচিত নয়। এব্যাপারে স্বামী বা পরিবারের অন্য কারও সাহায্য নিতে হবে। যদি কখনও কাশি বা হাঁচি আসে তবে পেট হাত দিয়ে চেপে রাখতে হবে, নইলে পেটের ভিতরে ঝাঁকি লেগে প্রচণ্ড ব্যথা হতে পারে।

ছবিসূত্রঃ Working Mother

ছোট-খাটো বা বাড়ির স্বাভাবিক কাজকর্ম সিজারের ৮ সপ্তাহ হবার আগে শুরু করা যাবে না। এরমধ্যে অফিস, জিম বা গাড়ি চালিয়ে কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। এসময় ভারী ব্যায়াম করা একদম নিষেধ। তবে হাল্কা হাঁটাচলা করা যেতে বাড়ে। বরং একটু হাঁটাচলা সেলাই দ্রুত শুকাতে সাহায্য করে, পেটে গ্যাস জমতে দেয় না এবং কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে রেহাই দেয়।

মায়ের পক্ষে সিজারের পর কিছুদিন নিজের থেকে ওঠা-বসা করা সম্ভব হয় না। তাই কারও সাহায্য নিয়ে শরীর মুছিয়ে নিতে পারেন। তবে সেলাইয়ের স্থান সবসময় শুকনো রাখতে হবে। সিজারের ৩দিন পর থেকেই মা গোসল করতে পারবেন তবে প্রথম কিছুদিন সেলাইয়ের স্থানে যেন একদম পানি না লাগে, সেটা খেয়াল রাখতে হবে। হেক্সিসল ইত্যাদি দিয়ে সেলাইয়ের স্থান পরিষ্কার করা যেতে পারে।

ছবিসূত্রঃ healthline.com

এছাড়াও মনে রাখতে হবে, এসময় মায়ের শারীরিক যত্নের পাশাপাশি মনের যত্ন নেয়াও প্রয়োজন। হরমোনাল ও পারিপার্শ্বিক নানা কারণে এসময় তীব্র অস্থিরতা, হতাশা, রাগ, আত্মহত্যার প্রবণতা, স্বামী-সন্তান বা বাড়ির সকলকে অসহ্য লাগা ইত্যাদি নানারকম অনুভূতি মনে সৃষ্টি হতে পারে। এগুলো বোঝামাত্রই আপনার স্বামী, কাছের মানুষ, বন্ধু বা কাউন্সিলরের সাথে যোগাযোগ করুন। এটি মোটেও অবহেলার বিষয় নয়।

৩. ব্যথা কমাতে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ নিন

ব্যথা কমাতে যেকোনো পেইন কিলার ওষুধ এসময় খাওয়া যাবে না। শিশু বুকের দুধ পান করার কারণে এসময় কোনো ওষুধ খেতে হলে  ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী খেতে হবে। ব্যথার তীব্রতা অনুযায়ী ডাক্তার ওষুধ প্রেস্ক্রাইব করে থাকবেন। বেশিরভাগ সময় ব্যথার সাপোজিটরি দেয়া হয়।

৪. পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করুন

গর্ভাবস্থায় মাকে যেমন শিশু ও মায়ের জন্য নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার খেতে হয়, সিজারিয়ান অপারেশনের পরেও শিশুকে পর্যাপ্ত খাবার সরবরাহ করার জন্য এবং মায়ের শরীর ঠিক রাখার জন্য পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।

টক জাতীয় ফল যেমন, মালটা, কমলা, আমড়া ইত্যাদি খেলে সেলাই দ্রুত শুকায়। এছাড়া সবধরনের খাবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খাওয়া উচিত, এতে শিশুও সবধরনের পুষ্টি পায়। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বিভিন্ন রকম শাঁক-সবজি খেলে বুকের দুধের স্বাদ বৃদ্ধি পায়, শিশুরও খাবার রুচি বাড়ে এবং পরবর্তীতে শাঁক-সবজি খাওয়ার প্রতি তার আগ্রহও থাকে।

ছবিসূত্রঃ American Health and Beauty

এছাড়া মাকে প্রচুর তরল জাতীয় খাবার খেতে হবে। কোনো কারণে এসময় মায়ের কোষ্ঠকাঠিন্য হলে মায়ের সেলাইয়ের স্থানে অনেক কষ্ট হয়। প্রচুর তরল ও শাঁক-সবজি খেলে মায়ের কোষ্ঠকাঠিন্য হবার সম্ভাবনা দূর করে।

কখন ডাক্তারের কাছে যেতে হবে?

সিজারিয়ান অপারেশনের পর সেলাইয়ের স্থানে হঠাৎ হঠাৎ অল্প জ্বালাপোড়া করা এবং পরবর্তী ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত রক্তস্রাব হওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু সতর্ক না থাকলে সেলাইয়ের স্থানে ইনফেকশন হয়ে যেতে পারে। যে লক্ষণগুলো দেখলে আপনাকে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যেতে হবে সেগুলো হলো:

  • প্রচুর রক্তস্রাব।
  • পা ফুলে যাওয়া বা লাল হয়ে যাওয়া।
  • বুকে ব্যথা।
  • শ্বাসকষ্ট হওয়া।
  • সেলাইয়ের স্থানে পুঁজ, রক্ত বা কোনো তরল দেখতে পাওয়া।
  • সেলাইয়ের স্থানে অস্বাভাবিক ব্যথা হওয়া।

এসকল শারীরিক সমস্যা ছাড়াও যদি মায়ের মানসিক সমস্যা যেমন: তীব্র অস্থিরতা বা হতাশা, রাগ, আত্মহত্যার প্রবণতা, স্বামী-সন্তান বা বাড়ির সকলকে অসহ্য লাগা ইত্যাদি দেখা দেয়, তাহলেও ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে জরুরি ভিত্তিতে।

মনে রাখতে হবে, প্রতিটি মায়ের সিজার-পরবর্তী অভিজ্ঞতা আলাদা হয়। কেউ কেউ খুব দ্রুত সুস্থতা পেলেও সবার ক্ষেত্রে এমন নাও হতে পারে। তাই অন্যের সাথে তুলনা না করে, নিজের ও নিজের সন্তানের প্রতি মনোযোগী হওয়ায় হবে উত্তম সিদ্ধান্ত।

Featured Image: Parents Magazine

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

More From: গর্ভবতী মায়ের যত্ন

DON'T MISS