তরুণ তরুণীদের মানসিক চাপের কারণ


২০১৪ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, তরুণ তরুণীরা প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে বেশি মানসিক চাপে থাকে। এর অবশ্য নানা কারণ রয়েছে। তরুণ তরুণীদের মানসিক চাপ থাকা বাবা মায়ের জন্য একটি বিপদসংকেত বলা যায়। কারণ তারা মানসিক চাপের কারণে যেকোনো ভয়াবহ সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে পারে, যা রোধ করার শক্তি বাবা মায়ের নেই।

তরুণ তরুণীদের মানসিক চাপ খুব জটিল কিছু নই। তবে বাবা মাকে তাদের সামলানোর ক্ষমতা থাকতে হবে। নয়তো খারাপ ও ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে।

কিশোর কিশোরীদের মানসিক চাপ কী?

ধরুন, আপনার কন্যা বা পুত্রের পরীক্ষা চলছে। তার কোনো বিষয়ে প্রস্তুতি ভালো না। আগের পরীক্ষায় সে ভালো ফলাফল করতে পারেনি। পরীক্ষার জন্য মানসিক টেনশন, হার্টবিট বেড়ে যাওয়া, দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হওয়া হলো মানসিক চাপ। পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হলে অভিভাবক হিসেবে আপনি যদি ভয়-ভীতি দেখান তাহলে সে আরো মানসিক চাপে ভুগবে।

Photo: Manchester Evening News

প্রতিটি মানুষের মানসিক চাপের ধরন ভিন্ন। সব বয়সের মানুষের মানসিক চাপ থাকলেও কিশোর কিশোরীদের ব্যাপারটি ভিন্ন। কারণ তাদের আবেগ প্রাপ্ত বয়স্কদের তুলনায় অনেক বেশি।

কোন বয়সের ছেলেমেয়ে অথবা মানুষ বেশি মানসিক চাপে থাকে?

আপনি নিশ্চয় ভাবছেন বিদ্যালয়গামী শিশুরা বেশি মানসিক চাপে থাকে। তবে গবেষকরা বলেন ভিন্ন কথা। আমেরিকার সাইলোজিক্যাল এ্যাসোসিয়েশন এর এক গবেষণায় বলা হয়েছে ১৮-৩৩ বছর বয়সের মানুষেরা সবচেয়ে বেশি মানসিক চাপে থাকে।

তরুণ তরুণীদের মানসিক চাপের উপসর্গ

চাপ শারীরিক ও মানসিক হয়ে থাকে। তরুণ তরুণীদের মানসিক চাপের বিভিন্ন উপসর্গ থাকে। জেনে নিন তরুণ তরুণীদের মানসিক চাপের উপসর্গ সম্পর্কে।

আবেগীয় উপসর্গ

যেসব মানুষের আবেগের গভীরতা বেশি থাকে তারা উত্তেজিত হওয়ার পরিবর্তে বেশি হতাশ থাকে। সামান্য বিষয় নিয়েও খুব হতাশ হয়ে যায়। মানসিক চাপে থাকা শিশু বা কিশোরেরা দুশ্চিন্তাগ্রস্থ, রাগান্বিত, নির্লিপ্ত, খিটখিটে স্বভাবের হয়ে থাকে।

Photo: VideoBlocks

তারা অতি সামান্য বিষয় নিয়েও রেগে যায়, হতাশ থাকে এবং অন্যের সাথে ঝগড়া কিংবা মনোমালিন্য মূলক আচরণ করে। এইসব স্বভাব যদি আপনার সন্তানের থাকে তাহলে বুঝে নেবেন সে মানসিক চাপে রয়েছে।

শারীরিক উপসর্গ

শিশু কিশোরেরা মানসিক চাপে থাকলে কেবল আবেগীয় উপসর্গ দেখা যাবে তা নয়, শারীরিক উপসর্গ দেখা যাবে। মানসিক চাপ শরীর ও আবেগকে অনেকটা ক্ষতিগ্রস্থ করে। মানসিক চাপে থাকলে মাথাব্যথা, ক্লান্তবোধ, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা, বুক ধড়ফড় করা, ক্ষুধা না পাওয়া ইত্যাদি লক্ষণ দেখা যায়। আপনার সন্তানের খেলাধুলা, ব্যায়াম ও বিনোদনের প্রতি আকর্ষণ কমে যেতে পারে।

Photo: MomJunction

এইসব উপসর্গ যদি আপনার সন্তানের মধ্যে দেখতে পান কিংবা লক্ষ্য করেন তাহলে বুঝে নেবেন, সে মানসিকভাবে চাপে রয়েছে।

আচরণগত পরিবর্তন

যেসব মানুষ মানসিক চাপের মধ্যে থাকে তাদের আচরণ দেখে বোঝা যায়। তারা একাধারে অনেক সময় ধরে ঘুমায়, বিষণ্ণ থাকে, খুব বেশি খায় অথবা একেবারে খায় না ইত্যাদি। তাছাড়া অন্যের সাথে রাগারাগি, সবার সাথে খারাপ আচরণ করা, সব কথাকে নেতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করা ইত্যাদি আচরণ করে থাকে।

আপনার সন্তান মানসিক চাপে থাকলে তাকে বোঝার চেষ্টা করুন। ঠাণ্ডা মাথায় কীভাবে মানসিক চাপ থেকে সন্তানকে বের করা যায় সে বিষয়ে ভাবুন।

জ্ঞানীয় উপসর্গ

মানসিক চাপ জ্ঞানীয় বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্থ করে। যেমন: স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, কোনো কিছু মনে রাখতে না পারা, দ্রুত পড়া মুখস্ত না হওয়া ইত্যাদি। আপনার সন্তান পড়া মনে না রাখতে পারলে ভাববেন না সে অবহেলা করছে কিংবা মনোযোগ দিয়ে পড়ছে না।

Photo: Daily Mail

শিশু কিশোরেরা মানসিক চাপে থাকলে পড়া মনে রাখতে পারে না। আপনি যদি এই ধরনের কোনো উপসর্গ আপনার সন্তানের মধ্যে খুঁজে পান তাহলে না রেগে তাকে সমর্থন করা, তার সাথে হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করুন।

উপরোক্ত লক্ষণগুলো ছাড়াও আরো অনেক লক্ষণ রয়েছে। যেমন:

  • আশাহত থাকা, স্বপ্ন দেখতে ভয় পাওয়া।
  • অযৌক্তিক ইচ্ছে পোষণ করা।
  • অধিক ওজন কমে যাওয়া।
  • নিজেকে সর্বদা অসহায় ভাবা।
  • মেয়েদের ঋতুচক্রের সময় পরিবর্তন হওয়া।
  • সব ব্যাপারে নির্লিপ্ত থাকা।

তরুণ তরুণীদের মানসিক চাপের কারণ

আপনার সন্তান যেসব কারণে মানসিক চাপে পড়তে পারে সে কারণগুলো সম্পর্কে জেনে নিন।

পড়াশোনার চাপ

শিশু কিশোরেরা অধিকাংশ সময় পড়াশোনার চাপে অতিষ্ঠ থাকে। ছোট বয়সে মাত্রাতিরিক্ত হোমওয়ার্ক, পড়াশোনা, প্রজেক্ট ইত্যাদি সামাল দিতে হয়। ভালো স্কুল কিংবা কলেজে ভর্তি হওয়ার তীব্র প্রতিযোগিতা, ভালো রেজাল্ট করার প্রতিযোগিতা ইত্যাদির কারণে তারা মানসিক চাপে থাকে।

Photo: The Irish Times

যখন তার পাশের বন্ধু তার চেয়ে অধিক ভালো ফলাফল করেছে, কিন্তু সে ফেল করেছে এইসংক্রান্ত বিষয়ে মানসিকভাবে চাপে থাকে তারা।

শারীরিক চাপ

মানসিকভাবে চাপে থাকলে তা শরীরেও আঘাত হানে। কারণ দুশ্চিন্তা করতে করতে তাদের শারীরিক অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। যেমন: ক্ষুধা না পাওয়া, মাথাব্যথা করা, অল্পতে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে যাওয়া ইত্যাদি।

Photo: Iris.xyz

অবশ্য অধিকাংশ শিশু কিশোরেরা বোঝাতে পারে না তাদের শারীরিক উপসর্গগুলো কী কী।

সামাজিক সমস্যা

শিশু কিশোরেরা পরিবারের চেয়ে বন্ধুদের বেশি প্রাধান্য দেয়। পারিবারিক আড্ডা, রীতিনীতি তাদের কাছে অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। সামাজিক কোনো অনুষ্ঠানে গিয়ে আনুষ্ঠানিক পোশাক, কথাবার্তা চালিয়ে যাওয়া তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।

পারিবারিক সমস্যা

কিশোর কিশোরীরা পারিবারিক বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে মানসিক চাপে থাকে। যদি পরিবারের কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হয়, বাবা মায়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়, বাবা মা সন্তানের প্রত্যাশা পূরণ না করলে, ভাই-বোনদের সাথে ভালো সম্পর্ক না থাকলে তারা মানসিক চাপে ভুগতে পারে।

এসব সমস্যা ছাড়াও আর্থিক সমস্যা, প্রেমঘটিত ব্যাপার, ভাই-বোনদের সাথে দ্বন্দ্ব, অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা, সহপাঠীদের সাথে মনোমালিন্য ইত্যাদি কারণে শিশু কিশোরদের মধ্যে চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

 

ফিচার ইমেজ সোর্সঃ Verywell Mind

 

 

 

 

 

 

Rikta Richi

রিক্তা রিচির জন্ম ৮ ই নভেম্বর ১৯৯৫ সালে বি বাড়ীয়ার নবীনগর থানার নবীপুর গ্রামে। ছোট থেকে ঢাকায় বসবাস। ২০১০ সালে মোহাম্মদপুর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে এস এস সি এবং ২০১২ সালে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এইচ এস সি পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হোম ইকোনোমিকস কলেজের “সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও এন্ট্রাপ্রেনরশীপ” বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। রিক্তা রিচি কবিতা লিখতে ভালবাসেন। নিয়মিত লিখছেন বাংলাদেশের বিভিন্ন ম্যাগাজিন, পত্রিকা ও জাতীয় দৈনিকে এবং ভারতের বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও পত্রিকায়। ২০১৬ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ “যে চলে যাবার সে যাবেই”। ২০১৯ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ "বাতাসের বাঁশিতে মেঘের নূপুর"।

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

More From: লাইফস্টাইল

DON'T MISS