নবজাতক যেসব সহজাত গুণ নিয়ে জন্মায়


জন্মের পরপর কোন শিশুরই শারীরিক সব কাজে নিয়ন্ত্রণ থাকে না। কিন্তু নতুন পরিবেশে টিকে থাকার জন্য প্রাকৃতিকভাবেই সে সহজাত কিছু কৌশল শিখে জন্মায়। এগুলোকে বলা হয় রিফ্লেক্স বা সহজাত গুণ বা প্রতিক্রিয়া। হঠাৎ শরীর টানা দেয়া, ঝাঁকি দিয়ে ওঠা, কারণে অকারণে পা ঝাঁকানো ইত্যাদি নানারকম প্রতিক্রিয়া নবজাতকের মধ্যে দেখা যায়। আর এগুলো দেখেই বোঝা যায় শিশুটি শারীরিকভাবে একদম সুস্থ আছে।

শিশু যত বড় হয় তত শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের উপর নিয়ন্ত্রণ আসে এবং এই রিফ্লেক্সগুলোর আর প্রয়োজন হয় না। সাধারণত নবজাতকের জন্মের কয়েক মাস পরই এই রিফ্লেক্সগুলো আপনা আপনি চলে যায়।

এখানে নবজাতকের এরকমই কিছু সহজাত বা জন্মগত ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বা প্রবণতা নিয়ে আলোচনা করা হল।

১. রুটিং রিফ্লেক্স

ছবিসূত্রঃ twitter.com

নবজাতকের সামনে যদি আপনি আঙ্গুল বা চোষ্য কোন কিছু নাড়াতে থাকেন তবে সে মুখ খুলে এদিক সেদিক মাথা নাড়িয়ে তা মুখে নেবার জন্য চেষ্টা করবে। আর আঙ্গুল মুখে ঢুকালে সে তা চুষতে থাকবে এবং কামড়াতে থাকবে। এই প্রবণতাকে বলা হয় রুটিং রিফ্লেক্স। এই রিফ্লেক্সের কারণেই জন্মের পর পরই সে স্তন্যপান করতে পারে।

২. মরো বা স্টার্টেল রিফ্লেক্স বা পড়ে যাওয়ার প্রবণতা

ছবিসূত্রঃ MedlinePlus

নবজাতকের মাথার নিচে এক হাত রেখে এবং কোমরের নিচে অন্য হাত রেখে যদি কিছুক্ষণ তাকে একটু উঁচুতে ধরে দোল দেয়া হয়, তাহলে দেখা যাবে সে হাত পা ছোঁড়াছুড়ি করা শুরু করেছে এবং ঘাড়টাও উপরের দিকে তুলছে যার অর্থ সে ভয় পেয়েছে এবং বলছে, “বাঁচাও, পড়ে গেলাম।”

আপনি যদি নবজাতকটির দুই হাত ধরে তাকে একটু ঝুলিয়ে রাখেন তখনও সে একই অভিব্যক্তি প্রকাশ করবে। এমনকি সে কান্নাও করে দিতে পারে। এই প্রবণতাকে বলা হয় স্টার্টেল রিফ্লেক্স।

৩. ওয়াকিং বা স্টেপিং রিফ্লেক্স বা হাঁটার প্রবণতা

ছবিসূত্রঃ CogniKids

দুই হাত দিয়ে নবজাতকের দুই বগলে ও ঘাড়ে শক্ত করে ধরে যদি তার পা দুটো মেঝেতে ছোঁয়ানো হয়, দেখা যাবে সে নিজের থেকেই হাঁটার মত ছন্দে দুই পা একবার ওপরে একবার নিচে রাখছে। একে বলে শিশুর স্টেপিং রিফ্লেক্স বা হাঁটার প্রবণতা। মনস্তাত্ত্বিকেরা বলেন, সম্ভবত এর মাধ্যমে সে অবচেতন মনে বুঝতে পারে যে সে হাঁটার জন্য এখনও প্রস্তুত নয়।

৪. গ্র‍্যাস্প রিফ্লেক্স বা হাত মুঠো করার প্রবণতা

নবজাতকের হাতের তালুতে নিজের আঙ্গুল ছোঁয়ালে দেখবেন সাথে সাথে শিশুটি শক্ত করে আপনার আঙ্গুল মুঠোর মধ্যে চেপে ধরেছে। এর মাধ্যমে সে বোঝাতে চায় যে সে আপনার কাছাকাছি থাকতে চায়, আপনাকে শক্ত করে ধরে রাখতে চায় এবং সবসময় আপনার স্পর্শ পেতে চায়। একেই বলে গ্র‍্যাস্প রিফ্লেক্স। এসময় দূরে বা কাছে বোঝার ক্ষমতা শিশুর হয় না বলে অনেক সময় দূরের জিনিস দেখলেও সে এমনি ভাবেই ধরার জন্য হাত বাড়িয়ে থাকে।

৫. টনিক নেক বা ফেন্সিং রিফ্লেক্স

ছবিসূত্রঃ Wikimedia Commons

যখন কোনো নবজাতক চিৎ হয়ে শুয়ে থাকে, খেয়াল করলে দেখবেন তার মাথাটি যেদিকে সেদিকের হাতটি সে প্রসারিত করে রাখে। অর্থ্যাৎ যদি তার মাথাটি ডান দিকে ঘোরানো থাকে তবে সে ডান হাতটি সোজা করে প্রসারিত করে রাখে আর ডান হাতটি থাকে মাথার কাছে পিছন দিকে। আবার যদি তার মাথাটি বাম দিকে ঘোরানো থাকে তবে সে বাম হাতটি সোজা করে তার সামনের দিকে প্রসারিত করে রাখে আর ডান হাতটি থাকে মাথার কাছে পিছন দিকে। শিশুর এই প্রবণতাকে বলা হয় টনিক রিফ্লেক্স।

তবে এই রিফ্লেক্সটি কী কারণে হয়ে থাকে তা এখনও জানা যায়নি। তবে এর দ্বারা শিশু যে কোনো দিকে ফোকাস করা শিখতে পারে।

৬. রাইটিং রিফ্লেক্স

ছবিসূত্রঃ Parenting

নবজাতকের মুখের উপর যদি কোনো কাপড় ফেলে রাখেন দেখবেন যে সে তা সরিয়ে দেবার জন্য বারবার মাথা নাড়াচ্ছে, হাত ছোঁড়াছুড়ি করছে। একে বলা হয় রাইটিং রিফ্লেক্স। এই প্রবণতাটি অনেকদিন পর্যন্ত থাকে এবং বয়সের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়।

৭. টাং- থ্রাস্ট রিফ্লেক্স

ছবিসূত্রঃ Your Baby’s Start to Solid Foods!

নবজাতকের মুখে যদি একটা ছোট চামচ স্পর্শ করানো হয়, দেখা যাবে সে জিহবা দিয়ে চামচ তা ঠেলে দিচ্ছে। এই প্রবণতাকে বলা হয় টাং-থ্রাস্ট রিফ্লেক্স। এই প্রবণতা শিশুর মধ্যে ৪-৬ মাস পর্যন্ত থাকে। একারণেই এই বয়সের আগে শিশুকে সলিড খাবার খাওয়ানো শুরু করানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। ৬ মাসের মধ্যে এই প্রবণতা সম্পূর্ণ চলে যায় এবং তখনই সলিড শুরু করা হয়।

তবে অনেক সময় শিশুর মধ্যে খাবার মুখে নেয়ার পর বমি করা বা উগরে দেয়ার একটি প্রবণতা থাকে। এটি স্বাভাবিক নয়। একে বলা হয় গ্যাস্ট্রোইসোফেগাল রিফ্লাক্স যা একধরনের রোগ। এমন হলে শিশুকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। সাধারণত বিশেষ কারণে এসিডিটি থেকে এমনটি হতে পারে।

৮. উইথড্রয়াল রিফ্লেক্স

এটি একটি আত্ম-প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া যা শিশু বয়স থেকে শুরু করে সারাজীবনই মানুষের সহজাত প্রবণতা হিসেবে বিদ্যমান থাকে। হঠাৎ শিশুর মুখের সামনে হাত বা কোনো জিনিস ধরলে সে সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য মাথা অন্য দিকে ঘুরিয়ে নেবে। এটাই হলো উইথড্রয়াল রিফ্লেক্স। এটি যদি কোনো শিশুর মধ্যে দেখা না যায় তবে বুঝতে হবে শিশুটির মস্তিষ্কজনিত কোনো সমস্যা আছে।

Featured Image: Pinterest

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

More From: শিশুর যত্ন

DON'T MISS