নবজাতকের ত্বক শুষ্ক ও খোসার মতো হয় কেন?


প্রত্যেক মা-ই চান একটি সুস্থ শিশুর জন্ম দিতে। আর তাই শিশু জন্মের পর মায়েরা শিশুর স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সববিষয় নিয়েই অতিমাত্রায় চিন্তিত ও সতর্ক হয়ে পড়েন। শিশুর অন্যান্য স্বাস্থ্যজনিত বিষয় ছাড়াও শিশুর যে বিষয়টি নিয়ে নানারকম মত সমাজে প্রচলিত তা হলো শিশুর ত্বক।

শিশুর ত্বকের জন্য কোন তেল ভালো, কোন লোশন ভালো, কী করলে শিশুর গায়ের রং উজ্জ্বল হবে ইত্যাদি নিয়ে মায়েদের চিন্তারও যেমন শেষ নেই, তেমনি সমাজে যৌক্তিক ও অযৌক্তিক মতবাদেরও যেন কমতি নেই।

ছবিসূত্রঃ Pinterest

এখানে জন্মের পর নবজাতকের ত্বক কেন শুষ্ক হয়ে যায় ও খোসার মতো উঠে যায় তার কারণ ও করণীয় সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

কেন নবজাতকের ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়?

জন্মের প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নবজাতকের মধ্যে নানা রকম পরিবর্তন আসতে পারে। তার চুলের রং এমনকি ত্বকের রঙও পরিবর্তিত হতে পারে। এরকমই শিশুর ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া ও হাত, পা, পায়ের পাতা, গোড়ালি ইত্যাদি বিভিন্ন জায়গায় চামড়া খোসার মতো উঠে যাওয়া খুব স্বাভাবিক কিছু পরিবর্তন।

ছবিসূত্রঃ baomoi.com

মায়ের গর্ভে শিশু এমনিওটিক স্যাক নামক থলির ভিতরে এমনিওটিক ফ্লুইড নামক তরলে সুরক্ষিত থাকে। সে সময়ে শিশুর শরীর ভারনিক্স নামক একটি ঘন তরল দ্বারা আবৃত থাকে যা শিশুর ত্বককে ক্ষতিকর পদার্থ থেকে সুরক্ষিত রাখে। জন্মের পর পর নার্স শিশুর শরীর মুছে দিয়ে যতটা সম্ভব এই ফ্লুইডের  আবরণ তুলে ফেলার চেষ্টা করেন। আর এই আবরণ যখনই সম্পূর্ণভাবে চলে যায় তখনই শিশুর ত্বক বাতাসে উন্মুক্ত হয়ে পড়ে ও ধীরে ধীরে শুষ্ক হয়ে পড়ে।

জন্মের কতদিন পর শিশুর ত্বক শুষ্ক হতে শুরু করবে কিংবা কতটা অংশ খোসার মতো হয়ে উঠে যাবে তা নির্ভর করে শিশুটি ৩৮ সপ্তাহে জন্মেছে নাকি এর আগে বা পরে জন্মেছে তার উপর। কারণ জন্মের পর নবজাতকের শরীরে ভারনিক্স যত বেশি থাকে, শিশুর ত্বক শুষ্ক হওয়ার সম্ভাবনা তত কম থাকে। প্রিমাচ্যুর বা ৩৮ সপ্তাহের আগেই জন্মানো শিশুদের শরীরে ভার্নিক্সের পরিমাণ বেশি থাকে বলে এদের ত্বক শুষ্ক কম হয়।

তবে শুষ্ক ত্বক নবজাতকের ক্ষেত্রে খুব স্বাভাবিক ঘটনা ও তা কিছুদিন পর নিজের থেকেই নতুন চামড়া দ্বারা পরিবর্তিত হয়। এছাড়াও নানা কারণে শিশুর ত্বক শুষ্ক হতে পারে।

একজিমা

একজিমা এক ধরনের চর্মরোগ। এর কারণে শিশুর ত্বকে শুষ্কতা, লাল ফুসকুড়ি, ফাটার মতো দাগ ইত্যাদি দেখা দিতে পারে। এই জায়গা গুলোতে চুলকানিও থাকতে পারে। তবে এই সমস্যা সদ্য নবজাতকের মধ্যে খুব কমই দেখা দেয়। এটি সাধারণত কয়েক মাস বয়সী শিশুর মধ্যে বেশি দেখা দেয়। তবে কী কারণে এটি হয়ে থাকে তা এখনো স্পষ্টভাবে জানা যায়নি। তবে শিশুর ত্বকের জন্য উপযোগী নয় এমন তেল, সাবান, শ্যাম্পু ব্যবহারের কারণে এমনটি হতে পারে।

ছবিসূত্রঃ YouTube

৬ মাসের বেশি বয়সী অনেক শিশুর আবার খাবারের কারণেও একজিমা হয়ে থাকে। দুধ কিংবা দুগ্ধজাত দ্রব্য, সয়া, গম ইত্যাদি খাবারের প্রতি সংবেদনশীলতা থেকে থাকে। এরকম হলে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। তখন তিনি শিশুর খাবার বদলে দিতে পারেন। এমনকি শিশুর ব্যবহৃত প্রসাধন সামগ্রীও পরিবর্তন করে দিতে পারেন।

ইচথিওসিস

ছবিসূত্রঃ Riverview Science – PBworks

শিশুর ত্বক কিছুদিন পর পর শুষ্ক হয়ে গেলে বা চামড়া খোসার মতো উঠে গেলে তা জেনেটিক সমস্যার কারণেও হতে পারে। ইচথিওসিসও একটি বিশেষ ধরনের চর্মরোগ, যাতে শিশুর ত্বক ধীরে ধীরে কালো ও খসখসে হতে থাকে। শিশুর মা, বাবা বা পরিবারের কারো এই রোগ থেকে থাকলে তা শিশুটির মধ্যেও দেখা দিতে পারে। তবে এর কোনো দীর্ঘস্থায়ী চিকিৎসা নেই। বিশেষ ক্রিম বা ময়শ্চারাইজার নিয়মিত ব্যবহার করলে এই রোগ থেকে দূরে থাকা যেতে পারে।

শিশুর ত্বকের শুষ্কতা দূর করতে যা যা করণীয়

যদিও নবজাতকের শুষ্ক ত্বক খুব সাধারণ ব্যাপার, তবুও এটি অবহেলা করা ঠিক নয়। ত্বক শুষ্ক হয়ে গেলে যত দ্রুত সম্ভব তাতে যথোপোযুক্ত আর্দ্রতা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে নইলে চামড়া ফেটে রক্তও বের হয়ে যেতে পারে। এখানে শিশুর ত্বকের শুষ্কতা দূর করতে যেসব ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে তার কিছু টিপস দেয়া হলো।

১. বেশি সময় ধরে গোসল দেবেন না

ছবিসূত্রঃ bebemamae.com

শিশুর ত্বকে প্রাকৃতিকভাবেই তেল নিঃসৃত হয়। বেশি সময় ধরে গোসল দিলে যেমন নবজাতকের ঠাণ্ডা লাগার ভয় থাকে, তেমনি ত্বকের এই তেলও অপসারিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই আবহাওয়া গরম হলেও ৫-১০ মিনিটের বেশি সময় ধরে নবজাতককে গোসল করবেন না।

২. গোসলে গরম পানির বদলে কুসুম গরম পানি ব্যবহার করুন

গরম পানি দিয়ে গোসল করলে শরীরের আর্দ্রতা কমে যায়। তাই খুব অল্প বা কুসুম গরম পানি ব্যবহার করুন।

৩. দিনে দু’বার ময়শ্চারাজের লাগান

শিশুর শরীরে গোসলের পর ও অন্য যে কোনো সময় অন্তত দিনে দু’বার ময়শ্চারাইজার লাগান। তেলও লাগানো যেতে পারে। তবে আবহাওয়া বুঝে প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শমতো মানসম্পন্ন প্রসাধন সামগ্রী ব্যবহার করুন।

তবে নবজাতককে লোশন না লাগানোই ভালো। এতে শিশুর ঠাণ্ডা লেগে যেতে পারে। ভালো মানের বেবি অয়েল লাগানো যেতে পারে। তবে সরিষার তেল লাগানোর আগে আবহাওয়া বুঝে লাগাতে হবে। গরমের দিনে সরিষার তেল লাগালে এতে গরমে শিশুর এলার্জি বা অন্য সমস্যা দেখা দিতে পারে।

৪. শুষ্ক ও ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় শিশুকে বাইরে নিয়ে যাবেন না

বাইরের আবহাওয়া শুষ্ক হলে শিশুকে বাড়িতেই রাখুন। শুষ্ক বাতাসের সংস্পর্শে শিশুর ত্বকের আর্দ্রতা দ্রুত হারিয়ে গিয়ে আবার শুষ্কতা দেখা দিতে পারে।

এগুলো মেনে চললে কিছুদিনেই শিশুর ত্বকের শুষ্কতা চলে গিয়ে নমনীয় ও সুন্দর ত্বক আবির্ভূত হবে।

 

Featured Image: Medical News Today

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

More From: শিশুর যত্ন

DON'T MISS