নবজাতকের অরুচি বা খাবারের প্রতি অনীহা


নবজাতকের ক্ষুধামন্দা বা অরুচি বলতে বোঝায় যখন কোনো কারণে শিশুর খাওয়ার প্রতি অনীহা দেখা দেয়। ফলে শিশুটি পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় না এবং শিশুর ওজনও সঠিক হারে বৃদ্ধি পায় না। এমনকি শিশুর মানসিক বিকাশও ব্যাহত হয়।

নানা কারণে শিশুর এই অরুচি দেখা দিতে পারে। তবে কারণ যাই হোক না কেন, এর প্রধান সমস্যা হলো শিশুর অপুষ্টি ও কম ওজন। কারণ ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (WHO) এর মতে, প্রায় ৪৫ শতাংশ শিশুর মৃত্যু হয় এই অপুষ্টির কারণে।

ছবিসূত্রঃ MomJunction

নবজাতকের খাবারের প্রতি অনীহা যদি দীর্ঘদিন ধরেই চলতে থাকে এবং ওজন সঠিক হারে না বাড়ে তবে এটি অবহেলা করা উচিত নয়। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এটি শিশুর জন্য মারাত্মক ও ঝুঁকিপূর্ণ সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে অচিরেই।

যেসব কারণে শিশুর খাবারের প্রতি অনীহা দেখা দিতে পারে

নবজাতকের সঠিক পরিমাণে না খেতে পারার একটি প্রধান কারণ হলো প্রিম্যাচিউর বা ৩৮ সপ্তাহের আগেই শিশুর জন্মগ্রহণ। বিশেষ করে ৮ মাসে যেসব শিশুর জন্ম হয় এদের অধিকাংশেরই স্তন্য পান করা বা দুধ গেলার ক্ষমতা বা দক্ষতা থাকে না। তবে বয়স বাড়ার সাথে শিশুর খাবার চাহিদাও বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। কিন্তু যদি তা না হয় অবশ্যই যত দ্রুত সম্ভব শিশুটিকে ডাক্তার দেখানো প্রয়োজন।

ছবিসূত্রঃ paltimes.ps

কখনও কখনও কিছু সাধারণ রোগের কারণে এমনটি হতে পারে। যেমন:

  • ডায়রিয়া
  • কানের ইনফেকশন
  • সর্দি-কাশি হওয়া
  • দাঁত ওঠা
  • হার্পিস
  • জন্ডিস

এই রোগগুলোর চিকিৎসা হলে অরুচিও চলে যায়।

আরও যে সব মারাত্মক রোগের কারণে শিশুর অরুচি দেখা যায় তা হলো:

বেকউইথ-বিএডিমান (Beckwith-Wiedemann) সিনড্রোম

এটি শিশুর প্রতিবন্ধত্ব জনিত রোগ। এর ফলে শরীরের যে কোন অংশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃদ্ধি ঘটে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী সারা বিশ্বে ১৩,৭০০ জন নবজাতক শিশুর মধ্যে ১ জন শিশু এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এর কারণেও শিশুর অরুচি বা খাবারে অনীহা দেখা দিতে পারে।

কনজেনিটাল হাইপোথ্যারয়ডিজম (Congenital Hypothyroidism)

শরীরের একটি গুরুত্মপূর্ণ হরমোন হলো থাইরয়েড। এটি হার্ট, পরিপাকতন্ত্র, মাংসপেশির নিয়ন্ত্রণ, মস্তিষ্কের বিকাশ ইত্যাদি বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজের জন্য অতি প্রয়োজন। কিন্তু কনজেনিটাল হাইপোথ্যারয়ডিজম হলে থাইরয়েড গ্ল্যান্ড থেকে পর্যাপ্ত থাইরয়েড হরমোন প্রস্তুত হয় না। ফলে শরীরের বিভিন্ন কাজ ব্যাহত হয়, এর কারণেও শিশুর অরুচি হতে পারে।

 

ঝুঁকিপূর্ণ লক্ষণ

নবজাতকের খাবারের প্রতি অনীহা ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে হলে তা অত্যন্ত চিন্তার কারণ। তবে এর জন্য মাদের জানতে হবে কী কী লক্ষণ দেখলে বুঝতে হবে যে তা ঝুঁকিপূর্ণ।

ছবিসূত্রঃ Momtastic
  • ৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে না খেয়ে থাকলে এবং এরপরেও খেতে না চাইলে
  • ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের উপরে জ্বর থাকলে
  • খাওয়ার পর পরই বমি করে দিলে
  • বমির সাথে রক্ত গেলে
  • ঠাণ্ডা লাগলে এবং অনেকক্ষণ ধরে কাশতে থাকলে
  • না খেয়ে অনেকক্ষণ যাবত কান্না করলে
  • শিশুর মলের সাথে রক্ত গেলে

চিকিৎসা

সবসময় যে রোগের কারণেই শিশুর খাবারে অনীহা হয়ে থাকে তা নয়। তাই শিশুর অরুচি দেখলে বাড়িতেই কিছুদিন বিভিন্ন টিপস মেনে চলে শিশুর রুচি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করুন। কিন্তু তাতে কাজ না হলে ও দীর্ঘদিন যাবত শিশুর ওজন একই থাকলে বা কমে গেলে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন।

ছবিসূত্রঃ BabyCenter Canada

যেমন: শিশু যদি স্তন্য পান করতে না চায় তবে তা বাটিতে নিয়ে চামচ দিয়ে খাইয়ে দেখতে পারেন। আবার শিশু যদি ফর্মুলা খায় তবে ফর্মুলা দুধের ব্র্যান্ড পরিবর্তন করে দেখতে পারেন।

যদি শিশু বুকের দুধ খায় তবে মাকে কিছু নিয়ম মানতে হবে। যেমন:

  • দুধ খাওয়ানোর পূর্বে অন্তত ৩০ মিনিটের মধ্যে রোদে বা গরমে ঘোরাঘুরি, চুলার পাশে থাকা বা ব্যায়াম করা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকুন। নইলে গরম থেকে দুধে ল্যাকটিক এসিড সৃষ্টি হতে পারে, যা শিশুর হজমে সমস্যা করে খাবারে অরুচি আন্তে পারে।
  • মা যে খাবার খান তার সারাংশ বুকের দুধে থাকে, ফলে মায়ের খাবার পরিবর্তিত হলে দুধের স্বাদও পরিবর্তিত হয়। এর কারণেও শিশুর খাবারে অনীহা দেখা দিতে পারে। এমন হলে মা নিজের খাবার পরিবর্তন করে দেখতে পারেন।
  • কিছু ওষুধ আছে যেগুলো শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময়টুকুতে খেলে শিশুর সমস্যা হতে পারে। এসময় কোনো ওষুধ খাওয়ার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে খেতে হবে।

শিশুর ৬ মাস বয়স বা এর পরবর্তীতেও দুধ পান বা সলিড খাবারের প্রতি অনীহা আসতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, দুধ পানের বিকল্প কখনও সলিড খাবার হতে পারে না। প্রয়োজনে শিশুকে কিছুক্ষণ না খাইয়ে রেখে হলেও দুধ পান করতে হবে। আর সলিড খাবারে অনীহা দেখা গেলে কিছু টিপস মেনে চলে পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে যে রুচি আবার ফিরে আসে কিনা।

ছবিসূত্রঃ Verywell Family
  • খাবার পরিবর্তন করে দেখা যেতে পারে।
  • শিশু যদি কোনো ফল খেতে ভালোবাসে তবে শিশুর সিরিয়ালের সাথে সেই ফল মিশিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে।
  • একবারে বেশি না খাইয়ে অল্প অল্প করে ঘন ঘন খাওয়ানো যেতে পারে।
  • কেবল কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার না খাইয়ে, প্রতিদিন কোনো না কোনো ফল বা সবজি পিউরি ইত্যাদি খাওয়ানো হলে শিশুর পুষ্টি ঠিক থাকে।
  • একই খাবার প্রতিদিন না দিয়ে খাবার ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে।
  • শিশুর খাবারে বিভিন্ন রঙিন ফল বা সবজি পিউরি মিশিয়ে খাবার কে রঙিন করে আকর্ষণীয় করে খাওয়ানো যেতে পারে।

এগুলো মেনে চলার পরও শিশু না খেলে বা ওজন কমে গেলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

Featured Image: MomJunction

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

More From: শিশুর যত্ন

DON'T MISS