সন্তানের প্রতিভা বিকাশে আপনার করণীয় সম্পর্কে জানেন তো?


আবির (ছদ্মনাম) এবার ৭ বছরে পা দিল। পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলাতে ব্যাপক আগ্রহ আবিরের। অন্য শিশুদের মতো বিকালবেলা ব্যাট বল হাতে মাঠে দৌড়েই ক্ষান্ত হয় না সে। দুপুরেরে কড়া রোদ বা ঝুম বৃষ্টি সব প্রতিবন্ধকতাই যেন হার মেনে যায় আবিরের আগ্রহের কাছে। সেদিন তো ঘরের মাঝে ব্যাটে বলে ঠোকাঠুকি করতে গিয়ে একুরিয়ামটাই ভেঙ্গে ফেলল।

আবিরের খেলাধুলায় এই বাড়তি মনযোগ পছন্দ নয় তার বাবা মায়ের। ছেলের উৎসাহ-উদ্দীপনা একমাত্র পড়ালেখা কেন্দ্রিক হওয়াটাই সর্বত্তম বলে মনে করেন তারা। তাই আবিরের এমন আচরণে অনেক সময় বিরক্তই প্রকাশ করেন তারা।

এদিকে আবিরের বড় ভাই বেশ খেয়াল রাখেন আবিরের খেলাধুলার প্রতি। এই তো সেদিন ক্রিকেট কোচিংয়ে ভর্তি করিয়ে এলেন আবিরকে। খেলার জন্য কিনে দিলেন প্রয়োজনীয় সব সামগ্রী। তারপরেও মাঝে মাঝে মন ভার করে বসে থাকে আবির। সে ভাবে, “ইশ বাবা মাও যদি ভাইয়ার মতো খেলার ব্যাপারে উৎসাহী থাকত, তাহলে কতই না ভালো হতো।”

আবিরের মতো এমন ভাবনা যাতে আপনার শিশুকে ভাবতে না হয় সেজন্য তাকে বুঝতে চেষ্টা করুন; image source: understood.org

এমন ভাবনা আবিরের একার না। আমাদের চারপাশে এমন অজস্র আবিরের দেখা মিলবে অনায়াসেই। প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অনেক প্রতিভা হারিয়ে যায়  চিরদিনের মতো। একটু সাহায্য পেলে এমন মেধাবীরা কতটা আলো ছড়িয়ে দিতে সক্ষম সে সম্পর্কে আজ জানব।

এঞ্জেল কেন ইয়াং ডাকনাম একেই, রোনাল্ড ও বেথ ইয়াঙ্গের একমাত্র সন্তান। ৭ বছর বয়স থেকেই রোবটিক্সের ওপর ব্যাপক আগ্রহ একেইয়ের। ১২ বছরেরে মাথাতেই সে ঝুলিতে ভরে নিয়েছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নানা পুরস্কার। সন্তানের অর্জনে পিতা মাতার ভূমিকা অনস্বীকার্য একথা নতুন করে প্রমাণ দেবার প্রয়োজন নেই। তবে সন্তানের প্রতিভাকে বিকশিত করে এমন কাজে অভিভাবকের যথার্থ মুল্যায়নে সাফল্য ধরা দেয় খুব সহজেই।

গভীর মনযোগ দিয়ে নিজের ল্যাবে কাজ করছে একেই; image source: townandcountry.ph

একেইয়ের জীবনের গল্প থেকে সহজেই বোঝা যায় তার প্রতিভার মুল্যাইয়নে বাবা মায়ের অগ্রণী ভূমিকা পালন। যা খুব দ্রুত সাফল্য এনে দিয়েছে একেইয়ের জীবনে। রোনাল্ড ও বেথ দম্পতি তাদের সন্তানের জন্য আর্থিক, শারীরিক আর মানসিক সবরকম সহায়তার ব্যবস্থা করেছেন। তাদের বাসার একটি অংশ ছেলের কাজের জন্য বরাদ্দ করেছেন। রোবট তৈরির জন্য বেশ দামী যন্ত্রপাতিও কিনে দিয়েছেন সাধ্যমতো।

একেইকে রোবটিক্স বিষয়ক একাডেমীক জ্ঞানে এগিয়ে রাখতে  কোডিং স্কুলে ভর্তি করে দেন তারা। যদিও একেই কোডিং স্কুলে ভর্তি হবার মতো বয়স তখনও হয়নি। তারপরও তার মেধায় অভিভূত হয়ে কর্তৃপক্ষ তাকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে নিয়েছিল।

আসুন জানি, একেইয়ের ক্ষুদ্র জীবনের এতসব অর্জনের গল্প। জেনে নিই, একেইয়ের বাবা মার ছেলেকে সর্বাত্মক সহায়তা করার আপ্রাণ চেষ্টার ঘটনাগুলো। যার ফলে একেই তার মেধার দীপ্তি ছড়িয়ে দিতে পেরেছে এতো সহজেই। আপনার সন্তানের আগ্রহের বিষয়ের প্রতি আপনার ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত তাও জেনে নিতে পারবেন এই প্রবন্ধের মাধ্যমে। যাতে করে তাকে সর্বাত্মক সহায়তা দিয়ে যেতে পারবেন আপনার সোনামণিকে।

সন্তানের সাফল্যে আপনার ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি কার্যকর

আপনার শিশুটি কী পছন্দ করছে আর কোনটি তার অপছন্দের সেটি আপনার চেয়ে ভালো আর কেউ বলতে পারবে না। সেই ছোট্টবেলা থেকে তার মুখ দেখেই আপনি ঠাওর করতে পারেন তার অন্তরের খবর। তার সামর্থ্য আর দুর্বলতার জায়গাগুলো আপনার নখদর্পনে। তাই সন্তানের কীসে আগ্রহ, কোন ধরনের কাজে সে নিপুণতা দেখাচ্ছে তা খুঁজে বের করতে হবে আপনাকেই।

সন্তানের আগ্রহকে বুঝুন,তাকে সেভাবে সহায়তা করুন; image source: halton.ca

তারপর সে অনুযায়ী তাকে সহায়তা দেয়া, মানসিক, আর্থিক ও শারীরিকভাবে সবধরনের পৃষ্ঠপোষকতা করেই দেখুন। আপনার সোনামণির কর্মদক্ষতা দেখে অবাক হয়ে যাবেন আপনি নিজেই।

যেমনটি দেখা যায় একেইয়ের ক্ষেত্রে, মাত্র ৫ বছর বয়স থেকেই এমন খেলনা তৈরি করতে পারতো যা কিনা নড়াচড়া করতে সক্ষম।

একেই নিজেই কোডিং শিখে নড়াচড়াতে সক্ষম এমন খেলনা তৈরি করছে; image source; townandcountry.ph

এছাড়া অনলাইন থেকে কোডিং শিখে  খেলনা গাড়িকে রিমোটের সাহায্যে চলাচলে পারদর্শী করে তুলেছিল। তার এই আগ্রহ অভিভূত করে দেয় তার বাবা মাকে। তারা সিন্ধান্ত নেন, ছেলের এই প্রতিভাকে নষ্ট হতে দেয়া যাবে না কোনোক্রমেই। দেরী না করে ছেলের কাজে সবরকম সহায়তা করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন তারা।

একেইও তার সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করে খুব অল্প সময়ের মাঝে তার প্রাপ্তির খাতায় জুড়ে নিলো অনেকগুলো অর্জন। একেইয়ের এই প্রতিভাকে যদি তার বাবা মা গুরুত্ব না দিয়ে তাকে গতানুগতিক ধারায় দক্ষ করতে চাইতো, তাহলে হয়ত একেই এত দ্রুত সাফল্য অর্জন করতে পারতো না। তাই সন্তানের আগ্রহকে, কী বিষয়ে তার ভাললাগা বেশি এগুলোকে প্রাধান্য দিন। কারণ আপনার ভূমিকাই সন্তানের জীবনে সবচেয়ে বেশি ফলপ্রসূ।

আপনার হাত ধরেই তার যোগ্যতা আর দক্ষতার বিকাশ ঘটে

সবার আগে শিশুর সুপ্ত প্রতিভা আপনার নজরে আসে। সন্তানের মেধাকে আরো বেশি শাণিত করতে ছোটবেলা থেকেই চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। যত ছোট থেকে মেধার চর্চা হবে ততই দক্ষ হতে থাকবে শিশুটি।

ছোটবেলা থেকেই প্রতিভার চর্চায় সর্বাত্মক সহায়তা দিয়ে যান; image source: elitemusicinstrution.com

শিশু তার পছন্দের কাজ করতে করতে তার মাঝে অন্যান্য গুণাবলীর বিকাশ ঘটবে। আপনার সন্তান নাচ গান পছন্দ করে থাকলে এর সাথে সাথে সামাজিকতায় দক্ষ হয়ে উঠবে সে। নিত্য-নতুন মানুষের সাথে পরিচয় ঘটবে। পরিবর্তন হবে দৃষ্টিভঙ্গির।

একেইকে দেখলে আমরা নজির পাই তার বহুমুখী প্রতিভার। শুধু কোডিং কোচিংয়েই নয়। স্কুলের কার্যক্রমেও তার সক্রিয় অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়। স্বভাবগতভাবে একেই লাজুক প্রকৃতির হলেও, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রোবটিকস নিয়ে যখন একেই বক্তৃতা দেয় তখন তা হয় অনেক সাবলীল ও অনুপ্রেরণাদায়ক। এছাড়া একেই অভিনয়শিল্পী ও একজন ফটোসাংবাদিক। একেইয়ের এতসব গুনের প্রতিফলন ঘটাতে নিঃসন্দেহে তার বাবা মায়ের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি।

বর্তমানের ছোট বড় ত্যাগের বিনিময়ে সাফল্য মিলবে ভবিষতে

একেইয়ের রোবটের জন্য যন্ত্রপাতি কিনতে অনেক টাকা গুনতে হয় তার বাবা মায়ের। এমনও সময় এসেছে তার বাবার ব্যবসা থেকে ধার করেও যন্ত্রাংশ কিনতে হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতেও দমে যাননি তারা। একেইকে সবধরনের সাহায্য করে চলেছেন সর্বদা। রোনাল্ড দম্পতি জানেন, একদিন তাদের সন্তান প্রতিভাবলে অনেক গুণী একজন মানুষে পরিণত হবে। ঊজ্জল করবে তাদের নাম। এর চেয়ে বেশি কিছু চাহিদা আর কিইবা থাকতে পারে।

ফিচার ইমেজঃ: femalefirst.co.uk

 

 

 

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

More From: Parenting

DON'T MISS