শিশুর অ্যাংজাইটি ডিজওর্ডার কী? (পর্ব-১)


বলা হয়ে থাকে শিশুদের আবেগ ক্ষণস্থায়ী। শিশুর কোমল মনে প্রতিনিয়ত আবেগের ঢেউ দোলা দিয়ে যায়। এই হাসি পরক্ষণেই আবার কান্নায় ফেটে পড়ে। জেদ, ক্ষোভ, ভয়, দুশ্চিন্তা এগুলোকে বলা হয় আবেগের ক্ষতিকর বহিঃপ্রকাশ। এছাড়া আবেগের ফলে শারীরিক পরিবর্তনগুলো হল, অতিরিক্ত ঘাম, শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বৃদ্ধি, হাত-পা কাঁপা ইত্যাদি। শারীরিক আর মানসিক নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে শিশুর আবেগের অভিজ্ঞতার সুচনা হয়।

শিশুর আবেগের শারীরিক আর মানসিক নানাবিধ পরিবর্তন দেখা যায় অ্যাংজাইটি  বা উদ্বিগ্নতা নামক নেতিবাচক আবেগটির জন্য। কোনো ঘটনা বা পরিস্থিতির জন্য অজানা কারণে দুশ্চিন্তায় ডুবে যেতে পারে শিশুমন, যা শিশুর জন্য ক্ষতিকর। এমন পরিস্থিতিকে অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে।

image source: Drkaylenegenderson.com

রোগের শারীরিক লক্ষণ হিসেবে দেখা যায় শিশুর মাথাব্যাথা, অনিদ্রা, বমি বমি ভাব, তীব্র পেটে ব্যথা বা হজমে গোলযোগ ইত্যাদি। আর মানসিক লক্ষণগুলো হল, বন্ধুদের সাথে মনোমালিন্য, পড়ালেখায় মনযোগের অভাব, আচরণে অস্থিরতা, কাজেকর্মে ছটফটে ভাব ইত্যাদি।

অ্যাংজাইটি ডিজর্ডারকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। এই প্রবন্ধে গুরুত্বপূর্ণ দুইটি ডিজঅর্ডার নিয়ে আলোচনা করা হল। কয়েকটি পর্বে অ্যাংজাইটিগুলো ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হবে।

সেপারেশন অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার

আপনজন থেকে পৃথক হয়ে যাবার অহেতুক ভয়ে ভীত হতে থাকে শিশু। সমস্যাটি শুরু হবার আশংকা থাকে শিশুর ৬ বছরের পূর্ব পর্যন্ত। এরপর যদি অবস্থা আরো তীব্র হয় তবে তাকে সেপারেশন অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার নামে অভিহিত করা হয়।

প্রাক-স্কুলগামী শিশুদের মাঝে এই সমস্যার প্রকোপ বেশি দেখা যায়। অপরিচিত জায়গা স্কুলকে ভয় পাওয়া শিশুর জন্য স্বাভাবিক ব্যাপার। বেশ কয়দিন পরে নতুন জায়গাতে শিশু তার সামাজিক দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে অভিযোজন করে নিতে পারে। কিন্ত কয়েক মাস অতিবাহিত হবার পরেও এমনি চলতে থাকলে তা অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার বলে গণ্য হবে।

image source: centralohiomusictherapy.com

বেড়াতে গেলে বা আত্মীয় বাসায় গেলে সে যখন ইচ্ছা মায়ের কাছে ফিরে যেতে পারবে বা বাসায় ফিরে যেতে পারবে তাই তখন সে বেশ প্রফুল্ল থাকে।

image source: pinterest.com

কিন্ত স্কুল বা এমন কোথাও যেখানে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবস্থান করতে হবে সেখানেই বাধে বিপত্তি। পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ৭-১১ বছরের ৩-৪% শিশুর মাঝে সেপারেশন অ্যাংজাইটি বিরাজ করছে। স্কুল রিফিউজালের একটি বড় কারণ হিসেবে দায়ী করা হয় একে।

কীভাবে বুঝবেন সন্তান সেপারেশন অ্যাংজাইটিতে ভুগছে

শিশুর ভয় যদি স্কুলকেন্দ্রিক হয় তবে লক্ষ্য করা যায় সকাল হতেই শিশুর বমি ভাব, অসস্তি, পেটে ব্যাথা। কখনো আবার মাথাব্যাথার কথা বলতে শোনা যায়।

image source: youtube.com

এছাড়া হঠাৎ হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যাওয়া, আতঙ্কে লাফিয়ে ওঠা, হৃৎপিণ্ডের গতি বৃদ্ধি পাওয়া, ঘুমের মাঝেও আঙ্গুল চোষার অভ্যাস ইত্যাদি।

রোগের কারণ

স্বল্পমেয়াদী কোনো সমস্যা যেমন অসুস্থতার জন্য মেডিকেলে ভর্তি হওয়া ইত্যাদি থেকে শিশুর উদ্বিগ্নতা তৈরি হতে দেখা যায়।

দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার মধ্যে মা বাবার মধ্যে বিচ্ছেদ, পারিবারিক অশান্তি, দ্বন্দ্ব, কলহ, শিশুর প্রতি অবহেলা, মায়া মমতাহীন পরিবেশে শিশুর বেড়ে ওঠা ইত্যাদি।

image source: pinterest.org

শিশুকে যদি অতি নজরদারীতে রাখা হয়, শিশু পরিচালনার ধরন স্বৈরতান্ত্রিক (বাবা মায়ের মতামতই যেখানে প্রধান, শিশুকে মূল্যায়ন করা হয় না) তখন সাধারণত শিশুটি অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডারে ভুগতে পারে।

অ্যাংজাইটি ডিজওর্ডারের প্রভাবমুক্তির জন্য করণীয়

শিশুর অতিরিক্ত উদ্বিগ্নতার জন্য দায়ী কারণকে আগে খুঁজে বের করা প্রয়োজন। অভিভাবকের অতিরিক্ত নজরদারী, কড়া শাসন, স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব ইত্যাদি কারণ যদি শিশুর সেপারেশন অ্যাংজাইটির জন্য দায়ী হয়ে থাকে তবে সেসবের সমাধান আগে করতে হবে।

image source: tunedinparent.com

শিশুর এট্যাচম্যান ফিগার ( মা অথবা যায় সাথে শিশুর আসক্তি বেশি) এমন ব্যক্তি থেকে দূরে যাবার যুক্তিহীন ভয় শিশুকে তাড়া করতে পারে। কর্মজীবি মায়েদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা বেশি দেখা যায়। শিশুকে আশ্বস্ত করতে হবে। একটি নির্দিষ্ট সময় শেষে আবারো শিশুর কাছে চলে আসবেন, বাইরে যাবার সময় শিশুকে এভাবে আশ্বস্ত করে যেতে হবে। এভাবে কিছু কৌশল অবলম্বন করে শিশুর সেপারেশন অ্যাংজাইটি লাঘব করা যেতে পারে। অ্যাংজাইটির মাত্রা অস্বাভাবিক পর্যায়ে চলে গেলে অবশ্যই মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

প্যানিক ডিজঅর্ডার

প্যানিক ডিজঅর্ডারের নিদিষ্ট কোনো কারণ এখনো জানা যায়নি। রোগটি বংশগত এবং সাধারণত মানসিক চাপজনিত কারণে হয়ে থাকে। রোগটি প্রাপ্তবয়স্ক ও বয়প্রাপ্তির সময়কালে বেশি পরিলক্ষিত হয়। পুরুষের চেয়ে নারীদের মাঝে প্যানিক ডিজর্ডার বেশি দেখা যায়। শিশুদের মাঝে এই রোগের বিস্তার নেই বললেই চলে।

প্যানিক ডিজঅর্ডারের লক্ষণ

প্যানিক ডিজর্ডারের নির্দিষ্ট কারণ এখনো অজানা। অবচেতন মনের কোনো দুশ্চিন্তা বা নেতিবাচক ঘটনা থেকে এর উদ্ভব বলে ধারণা করা হয়।

image source: vontagepointrecovery.com

স্বাভাবিক গতিতেই চলতে থাকে জীবন। হুট করে সময় সময় রাজ্যের ভয় চেপে বসে সারা মনজুড়ে। প্রায় মিনিট খানিক সময়ের মাঝে তীব্র হয়ে ওঠে এই অনুভূতি। বুকে তীব্র ব্যাথা, খুব বেশি ঘাম হওয়া, হৃৎপিন্ডের গতি বৃদ্ধি পাওয়া, শরীর ঝি ঝি করতে থাকে। রোগী বিচলিত, অস্থির অনুভব করে। ১০ মিনিটের মাথায় কমে আসে তীব্রতা। ২০-৩০ মিনিটের মাথায় প্রায় স্বাভাবিক হয়ে যায়। তখন শারীরিক উপসর্গ থাকে না, থাকে না কোনো ভয় বা অসস্তি।

পরিত্রাণের উপায়

অনেক সময় হৃদরোগ থেকে এমন সমস্যা হয়ে থাকে। তাই আপনার চিকিৎসক যদি এধরণের উপসর্গকে হৃদরোগের জন্য চিহ্নিত না করেন তবে আপনার উচিত একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া।

image source: drwell.com

এছাড়া শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম আপনাকে অনেকটাই স্বস্তি দেবে।

মূল লেখা: “টিনএজ মন”, ডাঃ মোহিত কামাল এর  গ্রন্থ অনুসারে ।

ফিচার ইমেজ সোর্স: pinterest.com

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

More From: লাইফস্টাইল

DON'T MISS