কৈশোরে ওজন বাড়ার অনাকাঙ্ক্ষিত কারণ ও সমাধান


অতিরিক্ত ওজন ছোট বড় সকলের প্রধান সমস্যা। কিশোর বয়সে অনেকের ওজন বেড়ে যায়। ওজন বাড়ার সুনির্দিষ্ট কোনো বয়স নেই। অভ্যাসের পরিবর্তনের ফলে, হঠাৎ করে হরমোনের পরিবর্তনের ফলে, অতিরিক্ত খাওয়া-দাওয়ার কারণে কিংবা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার কারণে যেকোনো বয়সের মানুষের ওজন বেড়ে যায়। ওজন বেড়ে গেলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যায়। এমনকি শরীর খুব মেদবহুল হয়ে যায়।

স্থূল কিশোরী; Source: Daily Mail

উচ্চতা অনুসারে আদর্শ ওজন থাকা জরুরি। তবে আদর্শ ওজনের অতিরিক্ত কম বা বেশি থাকলে দেখতে যেমন বেমানান ও অসুন্দর লাগে তেমনি কোনো পোশাক পরলেও মানায় না। তাই যেকোনো বয়সের মানুষের উচিত ওজন সুনির্দিষ্ট মাত্রায় ধরে রাখা। ওজন স্বাভাবিক এবং উচ্চতা অনুযায়ী ঠিক থাকলে স্বাস্থ্য ভালো থাকে, রোগমুক্ত থাকা যায়। কৈশোরে হঠাৎ করে ওজন বেড়ে যাওয়ার স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করতে হবে। জেনে নিন কৈশোরে ওজন বাড়ার কারণ সম্পর্কে।

দুশ্চিন্তা

আমেরিকান জার্নাল অফ পাবলিক হেলথের এক গবেষণা অনুযায়ী যেসব কিশোরীরা বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্থ থাকে তাদের বেশি ওজন বাড়ে। প্রায় পাঁচ শতাংশ কিশোর কিশোরী অতিরিক্ত বিষণ্নতায় ভোগে। আর বিষণ্ণতা ও দুশ্চিন্তা ওজন বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। কিশোরদের তুলনায় কিশোরীরা বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্থ থাকে। যার ফলে তাদের ওজন বাড়ে খুব দ্রুত।

দুশ্চিন্তাগ্রস্থ কিশোরী; Source: MomJunction

অতিরিক্ত বিষণ্নতা ও হতাশা মানসিক স্বাস্থ্য খারাপ করে এবং ক্ষুধা বাড়িয়ে তোলে। অনেক কিশোরী শুধুমাত্র খাওয়াকে মানসিক শান্তির প্রধান উপায় মনে করে। দেখা যায় অতিরিক্ত খাওয়ার কারণে শরীর মেদবহুল হয়ে পড়ে। তাই কৈশোরে কিশোর কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার ব্যাপারে অভিভাবককে সচেতন হতে হবে।

ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

আমেরিকার মেডিক্যাল এসোসিয়েশনের এক নিবন্ধতে বলা হয় কিছু ওষুধ সেবনের ফলে অনেক সময় ওজন বেড়ে যায়। অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধে ওজন বৃদ্ধির সম্ভাবনা বেশি। ওষুধের কারণে ওজন বৃদ্ধি পেলে দশ থেকে বারো সপ্তাহের মধ্যে নয় থেকে উনিশ পাউন্ডের মধ্যে থাকে।

কিশোরীর ওষুধ গ্রহণ; Source: Harvard Health – Harvard University

তবে অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের কারণেও ওজন বাড়ে। তাই আপনার সন্তানের ওজন বাড়ার মূল কারণ কি তা সম্পর্কে নিশ্চিত হোন। ওষুধ সেবনের ফলে ওজন বাড়লে নির্দিষ্ট সময় পর আবার কমে যেতে পারে। তবে যেকোনো সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করুন। চিকিৎসকের পরামর্শ কিংবা কোনো বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ খাওয়াবেন না।

থাইরয়েড সমস্যা

হাইপোথাইরিয়েডিজম এমন একটি রোগ যা সাধারণত মধ্যবয়সী মহিলাদের প্রভাবিত করে। তবে শিশু কিশোরদেরও থাইরয়েডজনিত সমস্যা হতে পারে। আর এই সমস্যা হলে ওজন বেড়ে যায়।

থাইরয়েড সমস্যা; Source: Scripps Health

থাইরয়েড গ্রন্থি যখন ব্যক্তির বিপাককে প্রভাবিত করে এবং পর্যাপ্ত পরিমাণের হরমোন উৎপন্ন করে না তখন বেশি বিপাকে পড়তে হয়। হাইপোথাইরয়েডিজমের উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে ঠাণ্ডা লাগা, ক্লান্ত লাগা, ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া অন্যতম। হাইপোথাইরিয়েডিজমের সমস্যা থাকলে দাঁতের সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

পলিস্টিক ওভারি সিনড্রোম

কিশোরীদের পলিস্টিক ওভারি সিনড্রোম দেখা দিলে ওজন বৃদ্ধি পায়। পলিয়েস্টিক ওভারি সিনড্রোম দেখা দিলে শরীরের অ্যান্ড্রোজেন হরমোন অত্যধিক পরিমাণের উৎপাদিত হয়। তাছাড়া চুলের বৃদ্ধি ঘটে, শরীরে মেদ জমে এবং অনিয়মিত ঋতুস্রাব হয়। আপনার সন্তান যদি হঠাৎ করে অস্বাভাবিক মোটা হয়ে যায় তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে নেবেন। চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলে সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।

ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য যেভাবে কিশোরীদের অনুপ্রাণিত করতে হবে

সাধারণত তরুণরা স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকে না। তারা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে, খাওয়া-দাওয়া করতে বেশি পছন্দ করে। তবে এমন আড্ডা ও খাওয়ার মধ্যে দিয়ে তারা নিজেদের অজান্তে নিজের ক্ষতি করে । যা তারা বুঝতে পারে না। কিশোর কিশোরীদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে জ্ঞান না থাকলেও অভিভাবকদের উচিত তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক সেমিনারে নিয়ে যাওয়া।

তবে আপনার স্বাস্থ্যবান সন্তানকে তিরস্কার করবেন না। কারণ আপনার তিরস্কার তাকে মানসিকভাবে আঘাত করবে। তাই তাকে কৌশলে স্বাস্থ্য সচেতন করে তুলুন। তার জীবনযাত্রায় পরিবর্তন নিয়ে আসুন।

স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণে অনুপ্রাণিত করুন

আপনি যদি আপনার সন্তানকে স্বাস্থ্যবান রাখতে চান তাহলে আজ থেকে ফ্রিজে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার রাখুন। কারণ আপনার সন্তান যখন কৈশোর পার করছে বা করবে তখন তার স্বাভাবিকভাবে অনেক ক্ষুধা লাগবে। আর সেসময় ফ্রিজে যা থাকবে সে তা খেতে চাইবে।

শাকসবজি ও ফলমূল; Source: American Heart Association

তাই ফ্রিজ থেকে চর্বি জাতীয় ও মিষ্টি জাতীয় সকল খাবার, চকোলেট, পেস্ট্রি দূরে সরিয়ে রাখুন। অথবা এসব খাবার কম কিনবেন। মিষ্টি জাতীয় খাবারের পরিবর্তে ফ্রিজে বেশি করে শাকসবজি, সিরিয়ালস, ওটস ও ফলমূল রাখুন। ফলমূল স্বাস্থ্যের জন্য অনেক ভালো। ফল খেলে আপনার সন্তান পুষ্টি পাবে। তার মস্তিষ্কের উন্নয়ন ঘটবে। ওটস ও সিরিয়াল খেলে সে প্রোটিন পাবে এবং অনেক সময় তার পেট ভরা থাকবে।

আপনিও চর্চা করুন

অনেক সময় মুখে বলে সন্তানকে বাধ্য করা যায় না। তাই তাকে সঙ্গে নিয়ে আপনি ব্যায়াম করতে বেরিয়ে পড়ুন, হাঁটতে চলে যান। আপনি নিজে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খান এবং নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন করুন। তাহলে আপনার সন্তানও আপনাকে দেখে শিখবে এবং আপনার কাজ কর্ম থেকে সে অনুপ্রাণিত হবে।

যোগাযোগ রক্ষা

আপনার সন্তানের মঙ্গলের জন্য তার সাথে বেশি বেশি কথা বলুন, আলোচনা করুন। কারণ ইতিবাচক কথা ও আলোচনা তাকে স্বাস্থ্যসচেতন করে তুলতে পারে। আপনি তাকে অতিরিক্ত ওজনের ভয়াবহতা সম্পর্কে জানান এবং গঠনমূলক আলোচনা করুন।

ডায়েট করা যাবে না

কৈশোরে কিশোর কিশোরীদের ডায়েট করার প্রয়োজন নেই। কেননা এটা বাড়ন্ত সময়। ডায়েটের পরিবর্তে তাকে পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ ফলমূল ও স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে দিন।

Featured Image Source: MomJunction

Rikta Richi

রিক্তা রিচির জন্ম ৮ ই নভেম্বর ১৯৯৫ সালে বি বাড়ীয়ার নবীনগর থানার নবীপুর গ্রামে। ছোট থেকে ঢাকায় বসবাস। ২০১০ সালে মোহাম্মদপুর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে এস এস সি এবং ২০১২ সালে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এইচ এস সি পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হোম ইকোনোমিকস কলেজের “সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও এন্ট্রাপ্রেনরশীপ” বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। রিক্তা রিচি কবিতা লিখতে ভালবাসেন। নিয়মিত লিখছেন বাংলাদেশের বিভিন্ন ম্যাগাজিন, পত্রিকা ও জাতীয় দৈনিকে এবং ভারতের বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও পত্রিকায়। ২০১৬ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ “যে চলে যাবার সে যাবেই”। ২০১৯ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ "বাতাসের বাঁশিতে মেঘের নূপুর"।

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

More From: লাইফস্টাইল

DON'T MISS