শিশুকে ওষুধ খাওয়ানোর সহজ কিছু উপায়


পরিবারের মধ্যমণিটির অসুস্থতায় সবার মনে ভর করে বিষণ্নতার ছায়া। ছোট্ট সোনামণির চিন্তায় নাওয়া-খাওয়া তুঙ্গে উঠে যায় সবার। শিশু নিজেও ঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারে না তার অনুভূতি। খিটখিটে মেজাজ ধারণ করে শিশু।

ওষুধ খাওয়ানো নিয়ে অভিভাবকেরা পড়েন বিপাকে। এ অবস্থায় সন্তানকে ওষুধ খাওয়ানোর জন্য অস্থির বাবা মা অনেক সময় অনেক কড়া শাসনকে বেছে নেন। কিছু চমৎকার উপায়ে সমধান করা যায় এই সমস্যা। আজকের প্রবন্ধে তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

শিশুকে জোর প্রদান না করে ইতিবাচক মনোভাব রাখুন

image source: livestrong.com

জোর করে ওষুধ খাওয়ানো থেকে বিরত থাকুন। শিশুকে ওষুধের ব্যাপারে ইতিবাচকভাবে বলুন। ইতিবাচকভাবে বোঝানো গেলে শিশু এ ব্যাপারে সহনশীল মনোভাব প্রকাশ করবে। শিশুকে চাপ প্রয়োগ না করে তার সাথে খেলা যেতে পারে। শিশুকে ওষুধ খাওয়ানোর ব্যাপারে কোলরাডো স্প্রিঙের আলিসা রবিন্সন বলছিলেন তার অভিজ্ঞতার কথা। শিশুকে নিয়ে খেলতে খেলতেই তিনি সেরে ফেলেন ওষুধ খাওয়ানোর কাজটি।

আপনার উদ্বিগ্ন চেহারা শিশুকেও দ্বিধায় ফেলে দেয়। সে ওষুধ জিনিসটাকে অহেতুক ভীতিকর কিছু ভাবতে আরম্ভ করে। তাই এ ব্যাপারে আপনার ইতিবাচক ভূমিকা শিশুকে ওষুধ গ্রহণে উৎসাহিত  করে তুলবে।

যোগ করতে পারেন বাড়তি স্বাদ

শিশুদের ওষুধে সাধারণত বাড়তি স্বাদ যোগ করা থাকে। তবুও দেখা যায় কিছু ওষুধের স্বাদ শিশুরা পছন্দ করছে না। এক্ষেত্রে বাড়তি স্বাদ যোগ করার সু্যোগ রয়েছে। অনেক ওষুধ কোম্পানি শিশুদের জন্য তৈরি করছে বিভিন্ন স্বাদ। যেমন : কমলা, আনারস, তরমুজ ইত্যাদি স্বাদের মাঝে আপনার শিশুর পছন্দমতো স্বাদটি বেছে নিতে পারেন।

শিশুকেই ওষুধ গ্রহণের পদ্ধতি বেছে নিতে দিন

শিশু কীভাবে ওষুধ খাবে সে সিদ্ধান্ত তাকেই নিতে দিন। তাকে একের অধিক উপায় বলে দিন। সিদ্ধান্তটা তাকেই নিতে দিন। এভাবে বলতে পারেন “তুমি চামচে করে ওষুধ খাবে নাকি কাপে করে খাবে?” ফলে সে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবতে শুরু করবে আর ওষুধ গ্রহণের ব্যাপারে সরাসরি না করার প্রবণতাও হ্রাস পাবে।

মজার কোনো উপায় বের করুন

শিশুরা বরফ খেতে বেশ পছন্দ করে। এই সুযোগটাকে কাজে লাগাতে পারেন। শিশুকে ওষুধ দেবার আগে সামান্য বরফ দিন। বরফ যেহেতু স্বাদ অনুভব করার গ্রন্থিতে প্রভাব বিস্তার করে এজন্য ওষুধের তেতো স্বাদ শিশু বুঝতে পারবে না। ফলে শিশু বরফের জন্য হলেও ওষুধ খেতে আগ্রহ দেখাবে।

image source: the happay family movement

এছাড়া কিছু ওষুধ হিমায়িতকরণে তাদের স্বাদে তেতোভাব কমে আসে। তেমন একটি হলো স্টেরয়েড। হিমায়িত করার ফলে কমে আসে এর তেতোভাব। এমনটাই বলেন ড. টলচার।

বাড়াতে পারেন ওষুধের উষ্ণতা

বিশেষ করে চোখের ড্রপের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারেন এই পদ্ধতি। চোখে ওষুধ প্রয়োগের আগে ড্রপারটিকে কিছুসময় হাতের মুষ্টিতে ধরে থাকুন। ফলে ওষুধে গরম ভাব আসবে। শিশু আরামবোধ করবে।

আবার অনেক সময় ড্রপার থেকে চোখে ওষুধ প্রয়োগের সময় শিশু চোখ পিটপিট করতে থাকে বা চোখ খুলতে চায় না। এতে চিন্তার কিছু নেই। বেশিরভাগ আই ড্রপ চোখের মাংসল জায়গা বা চোখের ভাঁজে প্রয়োগ করলেও পরে তা চোখের ভেতরে প্রবেশ করে।

শিশুকে ডাক্তার সেজে খেলতে দিন

নাটকীয় বা কাল্পনিক খেলা খেলতে শিশুরা পছন্দ করে। শিশুরা তার আশেপাশের পরিবেশ থেকেই তার খেলার চরিত্ত্ বেছে নেয়। লক্ষ্য করলেই দেখা যায় শিশুরা বিভিন্ন পেশাকে অবলম্বন করে খেলতে বসে যায়।

image source: LATINA MOMS

ডাক্তার সেজে খেলাও তাদের কাছে বেশ জনপ্রিয় একটি খেলা। শিশু ডাক্তার সেজে খেলার মাধ্যমে অহেতুক ডাক্তার ও ওষুধভীতি কমে আসবে। শিশুরা ওষুধ গ্রহণেও আগ্রহ দেখাবে।

সৎ থাকুন

শিশুদের ওষুধ খাওয়ানোর ব্যাপারে মিথ্যা বলা একেবারেই অনুচিত। স্বাদ ভালো না হলেও ভালো বলা ঠিক নয়। শিশুরা অনুকরণপ্রবণ হওয়াতে এভাবে তারাও মিথ্যা বলা শিখবে। আর আপনি হারাবেন বিশ্বাসযোগ্যতা।

image source: healthyessentials.com

শিশুকে ওষুধ খাওয়ার সুফল বলুন। তার ব্যথা বা অস্বস্তি কমে আসবে ওষুধ খেলে, সে আগের মতো সুস্থবোধ করবে, খেলাধুলাতে শক্তি পাবে, এভাবে বুঝিয়ে বলুন। নিজের কল্পনাশক্তিকে যেন শিশু ব্যবহার করতে পারে তাই এভাবে তার সাথে কথা বলুন। শিশুর আবেগীয় দিক থেকে যতো বেশি নাড়া দেয়া যাবে তাকে সে বিষয়ে মানানো ততোই সহজ। তাই মিথ্যার আশ্রয় না নিয়ে শিশুকে ওষুধের ইতিবাচক দিকগুলো নিয়ে বেশি বেশি বলতে চেষ্টা করুন।

আপনার চিকিৎসকের সাহায্য নিন

image source: diasporaro.co.uk

প্রতিটি শিশুর থাকে নিজস্বতা। তাই তাদের পছন্দ, রুচিও ভিন্ন। কোনো শিশু পছন্দ করে তরল ওষুধ আবার অনেক শিশুর পছন্দ চুষে খাবার ট্যাবলেট।

image source: everyday health.com

আপনার শিশুর মূল্যায়নকে প্রাধান্য দিন। চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে শিশুর পছন্দ অনুযায়ী যথার্থ ওষুধটি যাতে শিশু পায় তা নিশ্চিত করুন।

কিছু সতর্কবার্তা

  • শিশুদের ওষুধের ক্ষেত্রে কখনোই চিকিৎসকের পরামর্শপত্র ছাড়া ওষুধ কেনা বা হাতুড়ে ডাক্তারদের কথা অনুযায়ী শিশুকে ওষুধ খাওয়ানো একেবাড়েই উচিত নয়।

আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্সের এর তথ্য অনুযায়ী, ফার্মেসির ঠাণ্ডাজনিত ওষুধ যেগুলো চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যাতীত গ্রহণ করা হয় সেগুলো ৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য মোটেই কার্যকর হয় না। বরং হিতে বিপরীত হতে দেখা যায়। শিশুর অসুখ আরো জটিলতর হয়েএবং দেখা যায় নানা ধরনের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া।

  • সবসময় ওষুধের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে সনাতন উপায়ে নিরাময়ের ব্যাপারে বেশি জোর দিয়ে থাকেন চিকিৎসকেরা। প্রাকৃতিক উপাদানের সাহায্যে রোগ নিরাময়ে থাকে না কোনো পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া। আর ওষুধ কেনার বাড়তি খরচ বেঁচে যায় অনেকাংশেই। যেমন : শিশুর ঠাণ্ডাজনিত কারণে পর্যাপ্ত পরিমাণে তরল খাবার, বিশ্রাম, উষ্ণ পরিবেশ ইত্যাদি সনাতন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
  • আরেকটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নজরে রাখবেন ওষুধ কেনার সময়। ওষুধের মেয়াদ ঠিক আছে কিনা তা যাচাই করা বা আর কতদিন ব্যবহার করতে পারবেন ওষুধটি তা দেখে নেবেন।
  • শিশুর এন্টিবায়োটিক ওষুধদের ডোজ শেষ হলে অবশ্যই বাকি ওষুধগুলো ফেলে দিতে হবে। এন্টিবায়োটিকের ডোজের দিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে। ওষুধের ডোজ যাতে সম্পূর্ণভাবে শেষ হয় তা লক্ষ্য রাখুন।

Featured Image: huffingtonpost.com

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

More From: শিশুর যত্ন

DON'T MISS