শিশুদের ইনসমনিয়া কী? ইনসমনিয়ার কারণ ও প্রতিরোধ


ইনসমনিয়া বা অনিদ্রা বড়দের সমস্যা। তবে অনিদ্রা সমস্যা যে ছোটদের হয় না, তা নয়। শিশুদেরও ইনসমনিয়া বা অনিদ্রার সমস্যা হতে পারে। রাত জেগে থাকা, রাতে ঘুম না আসা শিশুদের মস্তিষ্কের ওপর চাপ ফেলতে পারে। নবজাতক শিশুরা দৈনিক বিশ ঘণ্টা পর্যন্ত ঘুমাতে পারে।

তবে নবজাতক শিশুর আদর্শ ঘুম হিসেবে ধরা হয় ষোলো ঘণ্টা ঘুমানোকে। তার চেয়ে বড় শিশুরা দৈনিক বারো চৌদ্দ ঘণ্টা ঘুমায়। শিশুদের সাথে অধিক ঘুমানোর ব্যাপারটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তবে শিশু যদি অনিদ্রা তথা নিদ্রাহীনতায় ভোগে তাহলে তা সত্যিই ভাববার বিষয়। একদিন বা দুইদিন নিদ্রাহীনতায় ভোগা চিন্তার বিষয় নয়। তবে দিনের পর দিন নিদ্রাহীনতায় ভোগা শিশুদের জন্য ক্ষতিকর।

ঘুমহীন বালক; Source: mnn.com

শিশুরা ইনসমনিয়া বা অনিদ্রায় ভুগলে রাতে ঘুমাতে পারে না, অধিক সময় ঘুমে থাকা কষ্টকর হয়, খুব তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙে যায়। ঘুমের এই সমস্যাগুলো দিনের বেলা শিশুদের ওপর প্রভাব ফেলে। ইনসমনিয়া দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। কখনো কখনো টানা তিন সপ্তাহ বা বেশ কয়েকদিন শিশু না ঘুমালে বা বারবার ঘুম থেকে জেগে উঠলে বুঝতে হবে শিশুর অনিদ্রা জনিত সমস্যা হচ্ছে।

ইনসমনিয়া বা অনিদ্রার কারণ

ইনসমনিয়া প্রাথমিক পর্যায় কিংবা মাধ্যমিক পর্যায়ের হতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ের ইনসমনিয়া হলে নিজেই এর সমাধান করা যায়। তবে যদি মাধ্যমিক পর্যায়ের ইনসমনিয়া হয় তাহলে চিকিৎসকের সাহায্য নিতে হবে। নানা কারণে শৈশবে অনিদ্রাজনিত সমস্যা হয়।

দুশ্চিন্তা

দুশ্চিন্তা কিংবা মানসিক স্ট্রেস অনিদ্রার অন্যতম প্রধান কারণ। শৈশবে তেমন কোনো দুশ্চিন্তা না থাকলেও কৈশোরে দুশ্চিন্তা থাকে। সাধারণত কিশোর কিশোরীরা নানা কারণে দুশ্চিন্তায় থাকে যার ফলে অনিদ্রা বা নিদ্রাহীনতায় ভোগে। অনিদ্রা সমস্যা বড়দের মাঝে প্রকট আকারে দেখা যায়।

শিশুরা অনেক সময় ভয় পাওয়ার কারণে ঘুমাতে পারে না, শোবার ঘরে বিকৃত আকৃতির প্রাণী থাকলে ঘুমাতে পারে না। কখনো কখনো অবাস্তব কিছু চিন্তার কারণে ঘুমাতে পারে না। আপনার সন্তান যদি নিদ্রাহীনতার কথা বলে তাহলে সন্তানের সাথে খোলামেলা কথা বলুন এবং অনিদ্রার কারণ বের করে আনুন।

দুশ্চিন্তাগ্রস্থ শিশু; Source: Hey Sigmund

সন্তানের বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাথে আলোচনা করুন এবং জানুন সেখানে কোনো প্রকার সমস্যা আছে কিনা। তাছাড়া বাসার পরিবেশ যেন সুন্দর ও কোলাহল মুক্ত থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখুন। শিশুর সাথে এমন কোনো আচরণ করবেন না যার ফলে সে সবসময় ভীত সন্ত্রস্ত থাকে বা থাকতে পারে। কারণ শিশু কিশোরেরা অতিমাত্রায় আবেগপ্রবণ হয়।

ওষুধ

শিশুর অনিদ্রাজনিত কারণে হুট করে কোনো কিছু না ভেবে দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলে চলবে না। আগে চিন্তা করতে হবে কেন শিশুর ঘুম হচ্ছে না। অনেক সময় ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে রাতে ঘুম হয় না।

শিশুর ওষুধ সেবন; Source: Everyday Health

এমনকি খাবার খাওয়ায় অনিয়ম দেখা দেয়। সেক্ষেত্রে ওষুধ সেবন শেষ হয়ে গেলে অনিদ্রা দূর হয়ে যাবে। এ নিয়ে বেশি চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই।

মানসিক, স্বাস্থ্যগত ও অন্যান্য সমস্যা

শিশুরা খুব কোমল হয়। তাদের নানা ধরনের আচরণগত সমস্যা থাকে। শিশুদের মাঝে ইনসমনিয়া দেখা দিলে প্রথমে উদ্বিগ্ন হবেন না। অনেক সময় শিশুদের মানসিক স্ট্রেস, চিন্তা থাকে যার ফলে তারা ঘুমাতে পারে না। অথবা ঘুমের মাঝে বার বার জেগে ওঠে। কখনো কখনো স্বাস্থ্যগত নানা কারণে শিশু ঘুমাতে পারে না।

শিশুর অ্যাজমা, হাঁপানি, সর্দি ইত্যাদি হলে তারা অস্বস্তিবোধ করে, যার ফলে সহজে ঘুমাতে পারে না। হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে যায়। শিশুর শরীর দূর্বল থাকলেও তার ঘুম ভেঙে যেতে পারে কিংবা ঘুমাতে সমস্যা হতে পারে। অপেক্ষাকৃত বড় শিশুদের হাঁটুতে ব্যথা, কোনো পেশীতে ব্যথার কারণে ঘুম ব্যাহত হতে পারে। যদি আপনার শিশুর এধরনের কোনো সমস্যা হয় তাহলে দুশ্চিন্তা করবেন না বরং সম্ভব হলে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান।

ক্যাফেইন ব্যবহার

শিশুরা যদি উচ্চ মাত্রার ক্যাফেইন জাতীয় পানীয় পান করে তাহলে তাদের ঘুমের সমস্যা হয়। সাধারণত শিশু কিশোরেরা যদি চা কিংবা কফি পান করে তাহলে তাদের ঘুম আসে না। ক্যাফেইন জাতীয় কোনো পানীয় পান করলে যদি শিশুর ঘুম না আসে তাহলে চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই।

শিশুর চা পান; Source: MomJunction

চিন্তিত না হয়ে আপনার শিশুকে চা ও কফি থেকে দূরে রাখুন। শিশুরা চা পান করলে অনেক সময় তাদের পেটের সমস্যা দেখা দেয়। তাই যথাসম্ভব শিশুদেরকে চা পান থেকে দূরে রাখুন।

পারিপার্শ্বিক অবস্থা

প্রশান্তি নিয়ে ঘুমানোর জন্য সুন্দর পরিবেশ প্রয়োজন। শিশুকে ঘুম পাড়ানোর পর আপনি যদি হৈচৈ করেন কিংবা বাসায় উচ্চ শব্দে গান ছেড়ে রাখেন, উচ্চ আওয়াজে টিভি ছেড়ে রাখেন তাহলে শিশুর ঘুম ভেঙে যাবে।

ঘুমন্ত শিশু; Source: Today’s Parent

তাই শিশু যখন ঘুমাবে তখন পারিপার্শ্বিক অবস্থা যেন শান্ত ও নীরব থাকে সেদিকে খেয়াল রাখুন। শিশুকে ঘুম পাড়ালে সাথে সাথে শিশু গভীর ঘুমে মগ্ন হয়ে যায় না। তাই শিশুর ঘুম গভীর পর্যায়ে না গেলে আপনি বিছানা ছেড়ে উঠবেন না।

শিশুদের ইনসমনিয়ার উপসর্গ

শিশুদের ইনসমনিয়ার উপসর্গগুলো হলো খুব সকালে ঘুম থেকে জেগে ওঠা ও সারাদিন ঘুম ঘুমভাবের মধ্যে থাকা, বিদ্যালয়ের পড়াশুনা ও কাজে কোনো আগ্রহ না পাওয়া, খুব ছোট ছোট ভুল করা, আক্রমণাত্বক স্বভাব থাকা, খিটখিটে ও রাগান্বিত মনোভাব থাকা।

শিশুদের ইনসমনিয়া হলে যা করবেন

  • শিশুদের সাথে সর্বদা ভালো ব্যবহার করবেন।
  • শিশুকে শান্তিপূর্ণ ঘরে রাখুন।
  • শিশুকে ঘুমের রুটিন বেধে দিন।
  • ঘুমের আগে শিশুকে এক গ্লাস গরম দুধ খেতে দিন।

Featured Image Source: Memory Foam Talk

Rikta Richi

রিক্তা রিচির জন্ম ৮ ই নভেম্বর ১৯৯৫ সালে বি বাড়ীয়ার নবীনগর থানার নবীপুর গ্রামে। ছোট থেকে ঢাকায় বসবাস। ২০১০ সালে মোহাম্মদপুর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে এস এস সি এবং ২০১২ সালে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এইচ এস সি পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হোম ইকোনোমিকস কলেজের “সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও এন্ট্রাপ্রেনরশীপ” বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। রিক্তা রিচি কবিতা লিখতে ভালবাসেন। নিয়মিত লিখছেন বাংলাদেশের বিভিন্ন ম্যাগাজিন, পত্রিকা ও জাতীয় দৈনিকে এবং ভারতের বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও পত্রিকায়। ২০১৬ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ “যে চলে যাবার সে যাবেই”। ২০১৯ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ "বাতাসের বাঁশিতে মেঘের নূপুর"।

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

More From: লাইফস্টাইল

DON'T MISS