শিশুর ৬টি শীতকালীন রোগের প্রতিকার সম্পর্কে জেনে নিন


ঋতুর পালাবদলে পরিবর্তন আসে প্রকৃতিতে। গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদ আর বর্ষার বৃষ্টিস্নাত প্রকৃতি এখন রুক্ষ শুষ্ক রূপ নিয়েছে। পরিবেশের পরিবর্তনের সাথে সাথে ভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে রোগ জীবাণুরাও হয়ে ওঠে সক্রিয়। সকল বয়সের মানুষ অসুস্থতাজনিত কারণে ভুক্তভোগী হলেও সবচেয়ে বেশি ভোগে শিশুরা। শীতকালে শিশুর সুস্থতা ও যত্নে আপনার করণীয় কি তা নিয়ে আজকের এই নিবন্ধ।

অতিরিক্ত ধুলাবালি বাতাসে মিশে থাকার কারণে শীতকালে রোগবালাই বেশি হয়। যেকোনো উন্মুক্ত জিনিসের সংস্পর্শে হাতে লেগে যায় অনেক ক্ষতিকর জীবাণু। এই জীবাণুরাই অনেক ধরনের অসুখ সৃষ্টিতে যথেষ্ট। বিশেষ করে টাকা, দরজার হাতল, সুইচ ইত্যাদি; যেগুলো বহুজনে ব্যবহার করে থাকে। এমন জিনিস ব্যবহার করার পর শিশু ও আপনার হাত যেনো যথাসম্ভব পরিষ্কার থাকে সেদিকে নজর দিন।

image source: CDC

এই সময়ের অসুখগুলো ছোঁয়াচে প্রকৃতির হয়। তাই বাসার কেউ আক্রান্ত হলে তার ব্যবহৃত জিনিসপত্র আলাদা রাখুন। চেষ্টা করুন আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ থেকে শিশুকে দূরে রাখতে।

ঠাণ্ডাজনিত জ্বর ও সর্দি                        

লক্ষণ

দূর্বলতা, হাঁচি, কাশি, সর্দি, খাবার অরুচি ছাড়াও শিশু মাথা বা গায়ে ব্যাথার কথা বলতে পারে।

image source: kinderminder.com

প্রতিরোধ

এসময়ে ঠাণ্ডা জাতীয় খাবার শিশুকে দেয়া যাবে না। কলা বা দই শিশুকে রাতে না খাওয়ানোই ভালো। ভিটামিন ‘সি’ যুক্ত খাবার যেমন লেবু, কমলা, আনারস, পেয়ারা ইত্যাদি মৌসুমী ফলের ও শাকসবজি দিতে হবে। বাদাম, মধু ইত্যাদি খাবারও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি এমন রোগের প্রতিষেধক হিসেবে দারুণ কাজ করে।

প্রতিকার

শিশু খুব বেশি অস্বস্তি প্রকাশ করলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইবুপ্রফেন বা এস্টামিনোফেন জাতীয় ওষুধ দেয়া যেতে পারে (শিশুর বয়স ৬ মাসের ওপরে হতে হবে)। তবে নিউ জার্সির হ্যাকেন্স্যাক ইউএমসি(UMC) এর পেডিয়াট্রিশন ফ্রেড হাইরাসেনফাং বলেন, এসব ওষুধের চেয়ে অনেক ভালো কাজ করে স্যালাইন স্প্রে। নাকে এই স্প্রে প্রয়োগে নাকে ঘনীভূত হয়ে থাকা মিউকাস সহজে তরল হয়ে ঝরে যায়। ফলে শিশু কোনো পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া ছাড়াই স্বস্তি লাভ করে।

এছাড়া প্রাকৃতিক প্রতিষেধকের ব্যবহারই সর্বোত্তম। মধু, আদা, তুলসী পাতা, গোল মরিচের মিশ্রণ বেশ ভালো প্রাকৃতিক প্রতিষেধক। এছাড়া প্রচুর পানি ও তরল খাবার খেতে হবে। বিশ্রামে থাকতে হবে।

টনসিল ইনফেকশন

লক্ষণ ও কারণ

এবারেও ঠাণ্ডাজাতীয় খাবারকে দায়ী করা হয়েছে। জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়ার কারণে সংক্রমিত হতে পারে। লক্ষণগুলো হলো গলা ব্যাথা, অস্বস্তিভাব ও গলা ফুলে যাওয়া। খাবার ও পানীয় গিলতে অস্বস্তি হওয়া।

image source: smelljoys.com

প্রতিরোধ

ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া খাবার খাওয়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে। পানি পানের বেলাতেও কুসুম গরম পানে শিশুকে উৎসাহিত করতে হবে। পরিবেশ খুব ঠাণ্ডা হলে বা বাইরে বের হবার আগে অথবা রাতে শিশু ঘুমাতে যাওয়ার আগে তার কান ও গলা যেনো উষ্ণ থাকে তাই আলাদা কাপড় ও টুপি পরিয়ে রাখা যেতে পারে। ফ্যান বা এসি চালু রাখলেও বাড়তি সচেতনতা জরুরি। মৌসুমি ফলমূল ও শাকসবজিও সুরক্ষা দেবে।

প্রতিকার

প্রাথমিক অবস্থায় কুসুম গরম পানিতে এক চিমটি লবণ গুলে গড়গড়া করলে আরামবোধ করবে শিশু। বিশ্রাম ও পর্যাপ্ত তরল খাবার গ্রহণ করতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

কানের সংক্রমণ

কারণ ও লক্ষণ

লক্ষণ হলো কানে ব্যাথা, বন্ধ কান বা কান চুলকানো। অতিরিক্ত সর্দি থেকে কান বন্ধ অনুভুতি হতে পারে। কানের ভেতরের অংশের ভেজাভাব থেকেও কানে সংক্রমণ দেখা দিতে পারে।

image source: parents magazine

প্রতিরোধ

শিশুর ঠাণ্ডা বা সর্দির প্রকোপ খুব বেশি হবার আগেই ব্যবস্থা নেয়া উচিত। বিশেষ করে ফুসফুস, কান, সানোসাইটিস আক্রান্ত হবার আগেই। শিশুর ভেজা কান ব্যাকটেরিয়ার বিকাশের জন্য অন্যতম উপযুক্ত একটি স্থান। তাই শিশুর গোসল শেষে কানের অঞ্চলটি ভালোভাবে মুছে দিতে হবে ও সাঁতারের সময় সাঁতার পোষাক ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে করে কানে পানি ঢুকবে না।

অনেকে কান পরিষ্কার করতে কটন বাড বা সূচালো জিনিস ব্যবহার করে থাকেন। বিশেষজ্ঞদের মতে কানের অযাচিত দ্রব্য স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই বেরিয়ে আসে। সেজন্য বাড়তি  কোনো কিছু ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। তাতে হিতে বিপরীত হতে পারে। খোঁচাখুঁচির ফলে সেগুলো কানের আরো গভীরে চলে যেতে পারে।

প্রতিকার

সংক্রমণের মাত্রা বেড়ে যাবার আগেই চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করুন।

আর, এস, ভি

কারণ ও লক্ষণ

রেসপিরেটরি সিনসিশাল ভাইরাস ফুসফুসে সংক্রমণের ফলে এই রোগ হয়ে থাকে। এর লক্ষণগুলো ঠাণ্ডাজনিত রোগের লক্ষণের সাথে অনেকাংশে মিলে যায়। কিন্তু যেসব শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম বা জন্মগতভাবে হৃদরোগ বা ফুসফুসের জটিলতা থাকে তাদের ক্ষেত্রে এই ভাইরাসটি খুব দ্রুত বিস্তার লাভ করে। যা ব্রংকাইলিটিস ও নিউমোনিয়ার মতো মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করে।

image source: childrens health

শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি অনেক বেড়ে গেলে, নিশ্বাস গ্রহণে সাঁ সাঁ শব্দ হলে বা নিশ্বাস নিতে খুব কষ্ট হলে, খাবারের আগ্রহ একেবারে কমে গেলে, অতিরিক্ত অবসন্নতা ভর করলে, ঠোঁটে বা গালে নীলচেভাব দেখা দিলে আর. এস. ভি. রোগের লক্ষণ বলে ধরে নিতে হবে।

প্রতিরোধ

অত্যধিক ধুলাবালি এড়িয়ে চলতে শিশুকে মুখে মাস্ক পরতে আগ্রহী করে তুলতে হবে।

পাকস্থলীতে সংক্রমণ (ভাইরাল গ্যাসট্রোয়েনটেরিটিস)

কারণ ও লক্ষণ

পচা ও বাসি খাবার গ্রহণ ও  দূষিত পানি পানের মাধ্যমে এই রোগের বিস্তার ঘটে। লক্ষণগুলো হলো তলপেটে ব্যাথা, ডাইরিয়া, বমি ও জ্বর। রোগটি সেরে উঠতে ডায়রিয়ার মতো সময় নিলেও শিশুর মলে ও কলিজায় জীবাণুটি কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত জীবিত থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রতিরোধ

খাবার গ্রহণের আগে শিশুর হাত অবশ্যই পরিষ্কার করতে হবে। এছাড়া খাবার রান্না ও পরিবেশনে সর্বোচ্চ পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রতিকার

image source: childrens health

প্রাথমিক অবস্থায় পানিশূন্যতা রোধে শিশুকে তরলজাত খাবার বেশি পরিমাণে দিতে হবে। তরল খাবার যেমন : খাবার স্যালাইন, ভাতের মাড়, ডাবের পানি, সরবত (কম চিনিযুক্ত) দেয়া যেতে পারে।

তবে একবারে বেশি না দিয়ে ১৫ মিনিট পর পর অল্প পরিমাণে দেয়ার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন ফিলাডেলফিয়া শিশু হাসপাতালের শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ মারিয়া কনয়েল। তিনি আরো বলেন, “শিশুর শারীরিক অবস্থার উন্নতির সাথে সাথে শিশুকে স্বাভাবিক খাবার দিতে হবে। এছাড়া এসময় টক দই শিশুর অন্ত্রের ক্ষতিকর অণুজীব ধ্বংস করে উপকারী ব্যাকটেরিয়া সৃষ্টিতে সাহায্য করে।”

জলবসন্ত

কারণ ও লক্ষণ

শীতকালীন সংক্রামক রোগগুলোর মাঝে জলবসন্ত অন্যতম। বায়ুবাহিত ছোঁয়াচে এই রোগের লক্ষণ হলো জ্বর ও চামড়ায় র‍্যাশ বা পানিভর্তি ফুসকুড়ির উদ্ভব।

image source: huffingtonpost.uk

প্রতিরোধ

সংক্রমিত ব্যক্তি থেকে শিশুকে দূরে রাখা ও শীতে শিশুর গোসলে কুসুম গরম পানি ও নিম পাতার ব্যবহার করা।

প্রতিকার

চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। আক্রান্ত স্থানে সরাসরি নখের স্পর্শ যেন না লাগে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। শিশুকে পরিপূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে। কাপড়-চোপড় ও নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্যাদি জীবাণুনাশক পরিষ্কারক দিয়ে প্রতিদিন পরিষ্কার করতে হবে।

featured image source: childrens health

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

More From: শিশুর যত্ন

DON'T MISS