শিশুদের মাঝে ইতিবাচক মনোভাব ছড়িয়ে দেওয়ার উপায়


শিশুরা কোমল ও অনুকরণপ্রিয় হয়ে থাকে। তারা অন্ধভাবে বাবা মাকে অনুসরণ ও অনুকরণ করে। ছোট থেকে পরিবারের সদস্যদের মাঝে যেসব স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করে সেগুলো নিজে নিজে রপ্ত করার চেষ্টা করে। তাই শিশুদের সামনে বাবা মায়ের সর্বদা ভালো আচরণ করা উচিত। বাবা, মা ও পরিবারের অন্যান্যরা যদি ইতিবাচক আচরণ করে তাহলে শিশুরা শৈশব থেকে ইতিবাচক মনোভাবের হয়।

সন্তানের সাথে মায়ের সুন্দর মুহূর্ত; Source: Working Mother

আর শিশুদের মাঝে ইতিবাচক মনোভাবের কৌশল ও উপায় ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি। শিশু যদি ইতিবাচক মনোভাবের হয় তাহলে সে অন্যকে সম্মান দিতে শিখবে, ন্যায় ও নৈতিকতা সম্পর্কে জানবে, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শিখবে এবং প্রতিটি কাজের মাঝে ইতিবাচকতা খোঁজার চেষ্টা করবে। জেনে নিন শিশুদের মাঝে ইতিবাচক মনোভাব ছড়িয়ে দেওয়ার উপায় সম্পর্কে।

আপনি রোল মডেল হোন

শিশুকে সুন্দরভাবে বেড়ে তোলার জন্য আপনি সর্বদা ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করুন। কারণ আপনাকে দেখে শিশু শিখবে। পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতা মানুষের জীবনে অগ্রগণ্য ভূমিকা রাখে। শুধুমাত্র উপযুক্ত পরিবেশের জন্যই মানুষ বন্য প্রাণীর থেকে আলাদা হয়। তাই শিশুকে ভালো পরিবেশের মধ্যে দিয়ে বেড়ে উঠতে দিন।

সন্তান ও মায়ের প্রতিজ্ঞা; Source: iBelieve

আপনি যে কাজই করুন না কেন, সর্বদা রোল মডেল হওয়ার চেষ্টা করুন। সন্তানের সামনে অবান্তর প্রতিজ্ঞা করবেন না। আর যদি প্রতিজ্ঞা করেন তাহলে তা রক্ষা করুন। কারণ আপনি প্রতিজ্ঞা রক্ষা করলে আপনার শিশুও প্রতিজ্ঞা রক্ষা করবে।

শিশুর কথায় মনোযোগ দিন

অভিভাবক হিসেবে আপনার সন্তানের কথায় মনোযোগ দিন। শিশুর যেকোনো কথা মনোযোগ সহকারে শুনুন এবং শোনার আগে কোনো বিচার করবেন না। কারণ চুপ করে শিশুর কথা শোনা সবচেয়ে বড় গুণ। এটি খুব শক্তিশালী। সন্তানের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলে সন্তান আপনাকে নির্ভরযোগ্য মনে করবে এবং আপনি সন্তানের কাছে সবচেয়ে প্রিয় পাত্র হতে পারবেন।

কথা দিয়ে কথা রাখুন

আপনি যদি আপনার সন্তানকে ভালোভাবে বড় করে তুলতে চান তাহলে আপনি তার সঙ্গে যে কথা দেবেন তা রক্ষা করুন। নয়তো সেও আপনাকে কথা দিয়ে কথা রক্ষা করবে না। মূল কথা হলো ওয়াদা ভঙ্গ করা মনোভাব নিয়ে সে বড় হবে। আপনি যদি তার কথা রাখতে পারেন তাহলে তাকে ‘হ্যাঁ’ বলুন, আর যদি না পারেন তাহলে ‘না’ বলুন। তাকে দ্বিধায় রাখবেন না।

পিতা ও কন্যার বেড়াতে যাওয়া ও দুষ্টুমি; Source: Parenting

আপনি যদি আপনার সন্তানকে সপ্তাহ শেষে চিড়িয়াখানায় বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার প্রতিজ্ঞা করেন তাহলে তা রক্ষা করুন। যদি শিশুপার্কে নিয়ে যাওয়ার প্রতিজ্ঞা করেন তাহলে তা পালন করুন। তাহলে আপনার প্রতি সন্তানের অগাধ বিশ্বাস স্থাপন হবে। এই অভ্যাসটি শিশুদের মাঝে প্রতিজ্ঞা রক্ষা করার শৃঙ্খলাবোধ তৈরি করবে। আপনাকে দেখে দেখে সেও প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে শিখবে, বন্ধুদের সাথে করা প্রতিজ্ঞার মর্যাদা রক্ষা করবে।

সাবধান থাকুন

আপনার সন্তানকে কখনো প্রকাশ করবেন না যে আপনি তার ওপর চরম বিরক্ত। কেননা আপনার বিরক্তির প্রকাশ তাকে অনেক মর্মাহত করবে। সে হয়তো নিজেকে অনেক অবহেলার পাত্র মনে করবে। শিশুদেরও আত্মমর্যাদাবোধ থাকে। তাই তাকে সর্বদা গুরুত্ব দিন এবং গুরুত্ব সহকারে তার সাথে কথা বলুন। আপনি যদি সন্তানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন তাহলে সেও আপনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের জায়গায় রাখবে।

যদি কখনো মনে হয় পরিবার ও বাচ্চা সামলাতে সামলাতে আপনি ক্লান্ত তাহলে কোথাও বেড়াতে যেতে পারেন। তবে সন্তানকে অবজ্ঞা করে নয়। সন্তানকে ভালোভাবে বুঝিয়ে বাইরে যান। প্রয়োজনে সন্তানকে পরিবারের গুরুজনের কাছে রেখে যান। তবে আপনি যে বন্ধু কিংবা আত্মীয়ের সাথে বেড়াতে যাচ্ছেন সেটা ঘুণাক্ষরেও তাকে বলবেন না। তাকে না নিয়ে গেলে সে কান্না করবে এবং জেদ ধরে বসে থাকবে।

তাই যেকোনো কাজ করার আগে ভাবুন কোনটি করা উত্তম হবে। আপনার বিবেচনায় যে কাজটি ভালো মনে হবে সেটি করুন।

‘না’ বলতে শেখান

আপনার সন্তানকে ‘হ্যাঁ’ শব্দটি শেখানোর সাথে সাথে ‘না’ শব্দটি শেখান। কারণ জীবনে চলার জন্য ‘না’ শব্দ জানার প্রয়োজন রয়েছে। আপনার সন্তানকে আপনি সব কাজের অনুমতি দেবেন তবে মাঝে মাঝে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ‘না’ বলবেন।

কারণ তার শেখার প্রয়োজন আপনার নিষেধ না ভাঙা তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কোনো কিছু পাওয়ার জন্য সে যত একগুঁয়েমি করুক না কেন, আপনি আপনার বিবেচনায় যেটিকে ভালো মনে করবেন সেটি করুন। কারণ আপনি আপনার সন্তানের ভালো-মন্দ বোঝেন।

মা ও সন্তানের আলোচনা; Source: Soberlink

সন্তানকে আদর করা ভালো। তবে অতিরিক্ত আদর করবেন না। প্রয়োজনে শাসন করুন। তাদের ভুল হলে ভুল ধরিয়ে দিন। মনে রাখবেন, শাসনের যেন নির্দিষ্ট মাত্রা থাকে। অতিরিক্ত কোনো কিছু ভালো নয়। অতি কঠোর শাসন করবেন না। এভাবে সন্তানকে শৃঙ্খলাবোধের মধ্যে রাখলে সে শৃঙ্খলার সাথে বেড়ে উঠবে। আপনার মতামতকে প্রাধান্য দেবে এবং আপনার কথা শুনবে।

প্ররোচিত করবেন না

সন্তানকে সর্বদা কোনো কিছু শেখানোর চেষ্টা করবেন না। কারণ সারাক্ষণ যদি শিশুরা আপনার কড়া নির্দেশের মধ্যে থাকে তাহলে তারা বিরক্ত হয়ে যাবে। সন্তানকে সবসময় আপনার কথার সাথে একমত হতে হবে, তা নয়। আপনি আপনার সন্তানকে মত প্রকাশের সুযোগ দিন। তাহলে তারা ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত নিতে শিখবে। ভালো মন্দ বিচার করতে শিখবে।

কখনো কখনো অতিমাত্রায় অভিভাবকত্ব হিতে বিপরীত ডেকে আনে। তাই অতিমাত্রার শাসন, অভিভাবকত্ব বর্জন করুন এবং সর্বদা স্বাভাবিক থাকুন। সন্তানকে ভালবাসুন এবং সন্তানের ভালবাসা অর্জন করুন।

অতিরিক্ত জোর করবেন না

শিশুর কোনো আচরণ আপনার মন্দ লাগতে পারে, কোনো কাজ হয়তো ভুল হতে পারে। সেই কাজের জন্য তাকে সর্বদা দোষারোপ করবেন না। বরং তাকে শিখিয়ে দিন কীভাবে সঠিকভাবে কাজ করতে হয়। শিশু পড়াশুনা করতে না চাইলে তাকে জোর করবেন না।

সন্তানকে নিয়ে বই পড়া; Source: wiseGEEK

তাকে পড়াশুনা করার সুবিধা ও উপকারিতার কথা জানান। এভাবে প্রতিনিয়ত তাকে ইতিবাচক পরিবেশের মধ্যে বেড়ে উঠতে দিন।

Featured Image Source: Parenting

Rikta Richi

রিক্তা রিচির জন্ম ৮ ই নভেম্বর ১৯৯৫ সালে বি বাড়ীয়ার নবীনগর থানার নবীপুর গ্রামে। ছোট থেকে ঢাকায় বসবাস। ২০১০ সালে মোহাম্মদপুর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে এস এস সি এবং ২০১২ সালে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এইচ এস সি পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হোম ইকোনোমিকস কলেজের “সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও এন্ট্রাপ্রেনরশীপ” বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। রিক্তা রিচি কবিতা লিখতে ভালবাসেন। নিয়মিত লিখছেন বাংলাদেশের বিভিন্ন ম্যাগাজিন, পত্রিকা ও জাতীয় দৈনিকে এবং ভারতের বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও পত্রিকায়। ২০১৬ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ “যে চলে যাবার সে যাবেই”। ২০১৯ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ "বাতাসের বাঁশিতে মেঘের নূপুর"।

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

More From: Parenting

DON'T MISS