বয়ঃসন্ধিকালে কিশোর কিশোরীদের যেসকল সামাজিক পরিবর্তন হয়


শৈশব পেরিয়ে শিশুরা যখন কৈশোরে পা রাখে তখন তাদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন ঘটে। শারীরিক পরিবর্তনগুলো শুরুর সাথে সাথে কিশোর কিশোরীরা একটু অন্যরকম স্বভাবের হয়ে যায়। এ সময়ে কিশোর কিশোরীদের মাঝে আবেগের গাঢ়তা থাকে। তাদের রাগ, অভিমান, ক্ষোভ, আনন্দ ইত্যাদি সবকিছুই থাকে একটু বেশি। বয়ঃসন্ধিকালকে অনেকে জটিল সময় বলেও অভিহিত করা হয়। এ সময়ে কিশোর কিশোরীদের আচার আচরণের ব্যাপক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। সামাজিক অনেক ব্যাপার তারা বুঝে উঠতে পারে না।

বাবা ও সন্তান; Source: familyFOCUS.org

অভিভাবক হিসেবে আপনার উচিত আপনার কৈশোরে পা রাখা সন্তানকে চোখে চোখে রাখা। সে যে বিষয়গুলো না বোঝে সেগুলো বুঝিয়ে দেয়া উচিত। হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য আপনার ইতিবাচক সমর্থন তাকে অনেকাংশে সফল করে তুলবে। তাই সন্তানের সাথে গ্রহণযোগ্য ও সমর্থনমূলক আচরণ করুন। বয়ঃসন্ধিকালে কিশোর কিশোরীদের মাঝে যেসকল সামাজিক পরিবর্তন সাধিত হয় তা হলো

নিজস্ব পরিচয় খোঁজা

শৈশবে শিশুরা কিছুটা আত্মভোলা ও খেলাধুলায় নিমগ্ন থাকলেও কৈশোরে তারা নিজস্ব পরিচয় খোঁজার চেষ্টা করে। তারা নিজেদের আরেকটু পরিপক্ক ভাবতে শুরু করে। অন্যদের কাছ থেকে ভালো ব্যবহার ও গ্রহণযোগ্য আচরণ প্রত্যাশা করে।

বিষণ্ণ কিশোরী; Source: sciencesource.com

কখনো কখনো সামাজিক নানা বিষয় নিয়ে বিষণ্ণতায় ভোগে। তবে তারা তখনো বুঝে উঠতে পারে না তারা শিশু নাকি কিশোর। আপনি যদি তাদেকে শিশু হিসেবে আখ্যা দেন তাহলে তারা রাগে ফেটে পড়বে। এমতাবস্থায় তাকে কিশোর বিবেচনা করা উত্তম এবং দায়িত্ববোধ শিখে নেওয়ার কৌশল শেখানো উত্তম।

অভিভাবকদের প্রতি পরামর্শ

এমতাবস্থায় আপনার সন্তানের সাথে মিশ্রিত আচরণ করুন। তাকে আরো স্বাধীনতা দিতে শুরু করুন। তাকে নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করার সুযোগ প্রদান করুন। আপনার সন্তানকে শৈশবে যেভাবে ভালবাসতেন, আদর করতেন সেভাবে কৈশোরেও ভালবাসুন, আদর করুন। তার কথা শুনুন এবং তাকে স্বাধীনতা প্রদান করুন। তাকে ছোট ছোট দায়িত্ব নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলুন।

আত্মমর্যাদা সম্পর্কিত

বয়ঃসন্ধিকালে কিশোর কিশোরীরা নতুন নতুন অনেক বন্ধুদের সাথে মেশে। তারা বন্ধুদের সামনে নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে চায়। বিভিন্ন মানুষের সাথে মেশার কারণে বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের মানুষ সম্পর্কে তারা অনেকটা ধারণা অর্জন করে। তাদের মধ্যে মানসিক পরিবর্তন ঘটে।

আড্ডা; Source: Scary Mommy

জের মর্যাদাকে ক্ষুন্ন করে কিংবা বিতর্কিত করে এমন কোনো কাজে সে বা তারা জড়াতে চায় না। কারণ তাদের মধ্যে ধীরে ধীরে আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত হতে থাকে। কখনো কখনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তারা নানা সংশয় ও দ্বিধায় ভোগে।

অভিভাবকদের প্রতি পরামর্শ

কৈশোরে আপনার সন্তানকে যথাসম্ভব সমর্থন করুন। সে যে কাজ করতে ভালোবাসে সে কাজে তাকে সমর্থন করুন। আপনি তাকে বোঝান তার যেকোনো প্রয়োজনে আপনি তার পাশে আছেন। এ সময়ে অতিরিক্ত শাসন করবেন না, অতিরিক্ত বকাঝকা করবেন না। কারণ অতিরিক্ত শাসন ও বকা ঝকা সন্তানের মনোবলকে ভেঙে দিতে পারে। আপনি তার সকল ধরনের পরিবর্তনকে মেনে নিন এবং তাকে সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করুন। তাকে যদি আপনি বিশ্বাস করেন তাহলে সেও আপনাকে বিশ্বাস করবে, ভালবাসবে।

অসঙ্গতিপূর্ণ আচরণের ঝুঁকি

বয়ঃসন্ধিকাল যেহেতু পরিবর্তনের সময়, আপনার সন্তানের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন ঘটবে। সে যেকোনো কারণে অনেক রেগে যেতে পারে এবং অসঙ্গতিপূর্ণ আচরণ করতে পারে। সে নিজেকে স্বাধীনরূপে প্রমাণ করার জন্য, স্বাধীন সত্তা হিসেবে নিজেকে মূল্যায়িত করার জন্য ঝেঁকে বসতে পারে। তাই পরিবারে আগে থেকে প্রচলিত যেকোনো নিয়মকে ভেঙে নিজের মতো করে বাঁচার স্বাধীনতা চাইতে পারে।

অসঙ্গতিপূর্ণ আচরণ; Source: newsinmind.com

বন্ধুবান্ধব কিংবা খারাপ সঙ্গীর সাথে মিশে আপনার সন্তানের মধ্যে কিছু কু প্রভাব ও কু অভ্যাস বাসা বাঁধতে পারে। যেমন নেশা করা, ধূমপান করা, ড্রাগের প্রতি আসক্তি ইত্যাদি। কিশোর বয়সে মানুষের হিতাহিত জ্ঞান ও বুদ্ধি তেমন থাকে না। এ সময়ে সে যেকোনো ভুল করে ফেলতে পারে। তাই কৈশোরকালীন দিনগুলোতে অভিভাবকের উচিত তার প্রতি যত্নশীল হওয়া এবং তার সকল কাজের প্রতি খেয়াল রাখা।

অভিভাবকদের প্রতি পরামর্শ

আপনার সন্তান যদি খারাপ স্বভাবের ছেলেমেয়েদের সাথে মেশে তাহলে তাকে সুন্দর ভাবে বোঝান। শান্ত মাথায় সবার সাথে খারাপ অভ্যাসগুলো পরিত্যাগ করার ব্যাপারে কথা বলুন। আপনার সন্তানের ভালো মন্দের ব্যাপারগুলো আপনাকে দেখতে হবে। তাই অযথা পরিবারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করে ঠান্ডা মাথায় সকল কিছু সমাধানের পন্থা খুঁজে বের করুন। সন্তানকে ভালো ও মন্দ কাজের মধ্যে পার্থক্য গুলো বুঝিয়ে দিন।

হতাশা ও নিজের ক্ষতিসংক্রান্ত

কৈশোরে ছেলে মেয়েদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। তারা যেকোনো পরিস্থিতিকে সামলাতে পারে না। এ সময়ে বিষণ্ণতা ও হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে যায় অনেকে। তাই হতাশার বেড়াজাল থেকে তাদের বের করা জরুরী। বাবা মা কিংবা বন্ধুদের সাথে কোনো আচরণের প্রেক্ষাপটে তারা যেকোনো সময় হিংস্র হয়ে যেতে পারে এমনকি নিজের বড় ধরনের ক্ষতি করে ফেলতে পারে।

হতাশাগ্রস্থ কিশোরী; Source: Evening Standard

হাত কাটা, নিজেকে রক্তাক্ত করা ইত্যাদি আচরণগুলো কিশোর কিশোরীদের মাঝে দেখা যায়। বিদ্যালয় বা কলেজের নানা বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে নেতিবাচক বিষয় কাজ করতে পারে। ফলাফল ভালো না হলে বিষণ্ণতা, উদ্বিগ্নতায় সে নিজেকে নিঃশেষ করে দিতে পারে। কারণ আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা তার কাছে যথেষ্ট কষ্টসাধ্য।

অভিভাবকদের প্রতি পরামর্শ

আপনি যদি আপনার সন্তানের মাঝে হিংস্র আচরণ দেখতে পান তাহলে তাকে ভালো করে বোঝান। তাকে বলুন জীবনে জয় পরাজয় থাকবেই। পরাজয়ের পরে জয় আসে। হেরে যাওয়া মানেই নিজেকে নিঃশেষ করে দেওয়া নয়। তাকে অধ্যবসায়ের গুরুত্ব বুঝিয়ে দিন। বার বার চেষ্টা করতে বলুন। হতাশা ও বিষণ্ণতাকে বিদায় জানানোর জন্য তাকে সঙ্গ দিন। তাকে সর্বদা আনন্দঘন পরিবেশে রাখুন।

Featured Image Source: The Sage School

Rikta Richi

রিক্তা রিচির জন্ম ৮ ই নভেম্বর ১৯৯৫ সালে বি বাড়ীয়ার নবীনগর থানার নবীপুর গ্রামে। ছোট থেকে ঢাকায় বসবাস। ২০১০ সালে মোহাম্মদপুর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে এস এস সি এবং ২০১২ সালে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এইচ এস সি পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হোম ইকোনোমিকস কলেজের “সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও এন্ট্রাপ্রেনরশীপ” বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। রিক্তা রিচি কবিতা লিখতে ভালবাসেন। নিয়মিত লিখছেন বাংলাদেশের বিভিন্ন ম্যাগাজিন, পত্রিকা ও জাতীয় দৈনিকে এবং ভারতের বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও পত্রিকায়। ২০১৬ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ “যে চলে যাবার সে যাবেই”। ২০১৯ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ "বাতাসের বাঁশিতে মেঘের নূপুর"।

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

More From: লাইফস্টাইল

DON'T MISS