শিশুর কয়েকটি ঘুমের সমস্যা ও সমাধান


শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ বাড়ন্ত শিশুদেরও ঘুমের সমস্যা হয়। কেননা তারা খুব দ্রুত শারীরিক এবং মানসিক বৃদ্ধির পর্বগুলো পার করে। এছাড়াও নানা কারণে শিশুর ঘুমের সমস্যা হতে পারে।

Source: Raising Children Network

আপনার শিশু যদি সম্পূর্ণ রাত জুড়ে ঘুমের সমস্যায় ভোগে এবং আপনাকে নির্ঘুম রাত কাটাতে বাধ্য করে, তাহলে বুঝবেন নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা হয়েছে। সাধারণত দাঁত এবং কানের সমস্যার কারণে শিশুরা নির্বিঘ্নে ঘুমাতে পারে না। কখনো কখনো একাকীত্ব বা অন্ধকার ভীতি থেকেও তারা নির্ঘুম থাকে। কারণ যাই হোক শিশুর ঘুমের সমস্যা যেমন তার স্বাস্থ্যের জন্য ভালো না, তেমনি আপনার পরিবারের জন্যও ভালো না।

শিশুর এমন ঘুমের সমস্যা স্বাভাবিক ব্যাপার। এ নিয়ে বিচলিত হবার কিছু নেই। তবে বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখবেন না। বাড়ন্ত শিশুর দৈনিক ১২ ঘণ্টা ঘুম আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে। না হলে শিশু ভবিষ্যতে নানা রকম শারীরিক জটিলতার সম্মুখীন হতে পারে।

চলুন বাড়ন্ত শিশুদের কিছু ঘুমের সমস্যা এবং তার সমাধান নিয়ে আলোচনা করি।

ঘুমের সময় বিদ্রোহ

বেশির ভাগ শিশু দিনের হৈ-হুল্লোড় শেষ করতে চায় না। তারা ঘুমের সময়ও ক্রমাগত খেলতে থাকে এবং ঘুম উপেক্ষা করে। এমনকি ঘুমের প্রয়োজনীয়তা বোধ করার মানসিক পরিপক্বতা তাদের মধ্যে থাকে না।

Source: Zero to Three

তাই অসুস্থ হয়ে কান্নাকাটি করলেও তারা ঘুমের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং খেলতে থাকে। তারা অন্যের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষা করে এবং বড়দের মতো জেগে থাকতে পছন্দ করে।

সমাধান

শিশুরা ঘুম নষ্ট করে এভাবে দীর্ঘক্ষণ খেলতে থাকলে তাকে হঠাৎ করে থামিয়ে দেবেন না। বরং তার সাথে চুক্তি করুন। পরবর্তী ১০ মিনিট সে খেলতে পারবে, এরপর তাকে ঘুমাতে হবে। প্রয়োজনে আপনার শিশুর ঘরে হালকা আলো জ্বালিয়ে দিন, ঘুমের পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য নরম সুরের সংগীতের ব্যবস্থা করুন। এমনকি নিজে তার বিছানার পাশে ঘুমিয়ে তাকে ঘুমাতে উদ্বুদ্ধ করুন।

ঘুমের মধ্যে জেগে ওঠা

শিশুরা ঘুমের মধ্যে হঠাৎ জেগে ওঠে এবং ভয় পেয়ে কান্নাকাটি জুড়ে দেয়। আসলে এসময় তাদের ঘুম চক্র শেষ হয়ে যায়। পরবর্তী ঘুম আসার আগে হঠাৎ করে এসে জেগে ওঠে এবং তার পাশে যদি নির্ভর করার মতো কাউকে না দেখে তাহলে সে ভয় পায়।

Source: Children’s Hospital

অথবা যদি ঘরটি অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকে তবুও সে ভয় পায় এবং ভয় পেয়ে কান্নাকাটি শুরু করে। যার ফলে পরবর্তীতে ঘুম আসার সম্ভাবনা নষ্ট হয়।

সমাধান

সাধারণত এমন ঘটনায় আপনি পাশে থাকলে শিশু আপনার থেকে ঘুমিয়ে যাবে। তাই তাকে নিজে ঘুমিয়ে পড়ার সুযোগ দিন। যদি সে নিজে না ঘুমায় তবে নতুন করে তার বিছানা প্রস্তুত করে দিন। অথবা হাতের স্পর্শে আপনার উপস্থিতি জানান দিন। তাৎক্ষণিক শান্ত করার জন্য ছোট খেলনা তার হাতে তুলে দিতে পারেন। দেখবেন কিছুক্ষণের মধ্যে শিশু আবার ঘুমিয়ে গেছে। তবে সব সময় বাড়ন্ত বয়সী শিশুদের কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করুন।

খুব তাড়াতাড়ি জেগে ওঠা

অনেক শিশু খুব তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে জেগে ওঠে। এমনকি পাখির ডাক শুনে অথবা হালকা কোন শব্দে তার ঘুম ভেঙে যায়। সাধারণত অভিবাবকরা মনে করে শিশুর বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে তার ঘুমের পরিমাণ কমে যায়। কিন্তু এটাই কি একমাত্র কারণ?

Source: Iisaraleigh

ক্ষুধা এবং পিপাসার কারনেও শিশুদের ঘুম খুব তাড়াতাড়ি ভেঙে যেতে পারে। এমনকি ঘরের মধ্যে শব্দ বা ঘরের পাশে শোরগোল এবং জানালা দিয়ে সূর্যালোক ভেদ করলেও শিশুর ঘুম ভেঙে যায়।

সমাধান

আপনি যদি শিশুর দীর্ঘ ঘুম নিশ্চিত করতে চান এবং তার ঘুমিয়ে থাকার সময়ে বাড়ির অন্যান্য কাজ সেরে নিতে চান, তবে শিশুর ঘুমের সময়সীমা পরীক্ষা করুন। রাতে তার পর্যাপ্ত ঘুম হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখুন।

প্রয়োজনে রাতে ঘুমানোর নির্দিষ্ট সময়ের ১/২ ঘণ্টা আগেই ঘুমের পরিবেশ সৃষ্টি করুন। শিশুর ঘরে শোরগোল বা উচ্চস্বরে কথা বলা বন্ধ করুন। ঘরে যেন মশা মাছি বা কোন পোকার উৎপাত না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখুন।

বিকেলের ঘুম

বিকালে বিশ্রাম এবং ঘুম শিশুর জন্য অত্যন্ত উপকারী। সব অভিভাবক এর গুরুত্ব বোঝেন। কিন্তু আপনার শিশু নাও বুঝতে পারে।

Source: Happiest Baby

তাই আপনি চাইলেও সব শিশু বিকালে ঘুমাতে চায় না। আবার কেউ কেউ বিকেলে ঘুমালে গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকে বা খেলতে থাকে।

সমাধান

এ অবস্থায় শিশুকে বিকালে ঘুমাতে বাধ্য করবেন না। বরং তাকে সকালে সক্রিয় করে তুলুন। সকালে তাকে খেলার মাঠে নিয়ে যান এবং শারীরিক কসরত হয় এমন খেলায় সম্পৃক্ত করুন। তাহলে দুপুরের মধ্যেই সে ক্লান্ত হয়ে যাবে এবং নিজের ইচ্ছায় বিকালে ঘুমানোর আগ্রহ প্রকাশ করবে।

ঘুম ভীতি

অনেক শিশুর মধ্যে ঘুম ভীতি আছে অর্থাৎ ভয়ের কারণে শিশু ঘুমাতে চায় না। শিশুর ভয় পাওয়ার জন্য ঘরের পরিবেশ অনেকাংশে দায়ী। হয়তো শিশুর ঘরে পর্যাপ্ত আলো নেই, তাই অন্ধকারাচ্ছন্নতার কারণে সে এমন কিছু দেখে বা কল্পনা করে যা তাকে ভীত করে তোলে।

Source: Sg Money Matters

এমনকি সে কল্পনায় ভূত বা দানবীয় কিছু দেখতে পারে। কেননা তার মস্তিষ্ক তখন পর্যন্ত পরিপক্ব না। এছাড়া নানান কারণে শিশুরা ভয় পেতে পারে আর এই ভয় থেকে তার ঘুম চলে যেতে পারে।

সমাধান

ভয় এবং দুঃস্বপ্ন এই বয়সের জন্য স্বাভাবিক। সুতরাং এতে বিচলিত হবেন না। আপনার শিশুকে শান্ত করতে তাকে উৎসাহ দিন এবং তার পাশে থাকুন। ঘরের পরিবেশ সুন্দর করুন। বিশেষ করে ঘরে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করুন।

শিশুকে কখনো ভূত বা ভীতিকর গল্প শোনাবেন না। তাকে হাসির এবং আনন্দের গল্প শোনান। ভয় পেলে শিশুকে নিজের চোখে সম্পূর্ণ ঘর পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ দিন। যেন সে নিশ্চিত হতে পারে যে ভীতিকর কিছু সেখানে নেই।

শিশুর সুন্দর ঘুম নিশ্চিত করতে আপনার প্রিয় উপস্থিতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং সব সময় আপনার শিশুর পাশে থাকুন। তার খোঁজ খবর নিন এবং তার ছোট ছোট সব সমস্যা সমাধান করে দেওয়ার চেষ্টা করুন।

Feature Image: Children’s Hospital

মোস্তাফিজুর রহমান
তরুণ কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট এবং সাংবাদিক মোস্তাফিজুর রহমানের জন্ম ও বেড়ে ওঠা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলা যশোরে। পৈতৃক নিবাস যশোরের সদর থানার খোজারহাট গ্রামে। বাবা-মায়ের তিন সন্তানের মধ্যে মোস্তাফিজুর রহমান সবার বড়। লেখাপড়া করেছেন যশোরের খোজারহাট মাধ্যামিক বিদ্যালয়, ছাতিয়ানতলা চুড়ামনকাঠি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ডা: আব্দুর রাজ্জাক মিউনিসিপ্যাল কলেজ এবং ঢাকার ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে। বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনা করলেও আত্মনিয়োগ করেছেন সাহিত্য সাধনা এবং সাংবাদিকতায়। শিল্প-সাহিত্যের প্রতি তীব্র অনুরাগী মোস্তাফিজুর রহমান স্কুল জীবন থেকেই লেখালেখি করেন। বাংলাদেশ ও কলকাতার সাহিত্য পত্রিকা, দৈনিক এবং ম্যাগাজিনে লিখে থাকেন। এছাড়া জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে দৈনিক পত্রিকায় কলাম লেখেন নিয়মিত। ২০০৯ সাল থেকে সাংবাদিকতার সাথে জড়িত, একটি অনলাইন পত্রিকা সম্পাদনাসহ কাজ করেছেন বিভিন্ন পত্রিকায়। সাম্প্রতিককালে তারুণ্য, শিল্প-সাহিত্য, চলচ্চিত্র এবং ট্রেন্ডিং বিষয় নিয়ে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইউটিউবে আলোচনা করেন। ইউটিউব সহ সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মোস্তাফিজুর রহমানকে @MustafizAuthor ইউজারে খুঁজে পাওয়া যাবে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘দ্বন্দ ও পথের খেলা’ প্রকাশিত হয়।

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

More From: শিশুর যত্ন

DON'T MISS