শিশুদের কামড়ানোর কারণ এবং সমাধান


আপনি সকালের নাস্তা তৈরি করতে ব্যস্ত, এমন সময় হঠাৎ আপনার পাঁচ বছর বয়সী সন্তান কাঁদতে শুরু করল। আপনি লক্ষ্য করলেন দুই বছর বয়সী শিশু সন্তান আপনার পাঁচ বছর বয়সী সন্তানকে দুই হাতে জাপটে ধরে কামড় বসিয়ে দিয়েছে। এই ঘটনা এবারই প্রথম নয়। প্রায়ই আপনার শিশু সন্তান তার বড় ভাই বা বোনের শরীরে এভাবে কামড় বসিয়ে দেয়।

Source: The Asian Parent

আপনি কী জানেন বাচ্চারা কেন এভাবে অন্যকে কামড়ায়? এটা কী কোনো সমস্যা? কীভাবে শিশুর এই প্রবণতা থেকে মুক্ত করা যায়?

আপনি হয়তো ভাবতে পারেন, শিশুরা কেন এভাবে কামড়ায় তার কোনো ব্যাখ্যা হতে পারে না। কিন্তু আপনাকে মানতেই হবে, শিশুর সব আচরণের পেছনে নিশ্চয়ই কোনো কারণ থাকে। শিশুরা কেন এভাবে কামড়াতে পারে তার কিছু কারণ এই নিবন্ধে আলোচনা করা হলো।

হতাশা এবং রাগ প্রকাশ করতে

শিশুদের কামড়ানোর অন্যতম প্রধান কারণ হতাশা, রাগ এবং আবেগ প্রকাশ করা। বাড়ন্ত শিশুরা যেহেতু কথা বলতে পারে না, তাই হতাশা, রাগ বা অনুভূতি প্রকাশ করার কোনো ভাষা তাদের থাকে না। সুতরাং অনুভূতি প্রকা করতে তারা কামড়ের ওপর নির্ভর করে।

Source: Efeu-Ev

সমবয়সী একাধিক শিশু বা ভাই বোন খেলতে বসলে একে অন্যের খেলনা দখল করার চেষ্টা করে। তখন অন্যজন খেলনা ফেরত পাওয়ার জন্য মুখে কিছু বলতে পারে না। সুতরাং প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে সে কামড়ের ওপর নির্ভর করে। এমনকি ভাই বোনের সাথে খেলতে খেলতে আবেগ, উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতেও শিশুরা কামড় বসিয়ে দেয়।

প্রতিক্রিয়া দেখানো

শিশুরা তার সাথে ঘটে যাওয়া যেকোন ঘটনার প্রতিক্রিয়া দেখাতে কামড়ের ওপর নির্ভর করে। যেমন ডে কেয়ার সেন্টারে এক শিশু প্রতিক্রিয়া পাওয়ার জন্য অন্য শিশুকে কামড় দিতে পারে। আবার প্রাপ্তবয়স্ক কেউ যদি তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে অন্য ঘরে স্থানান্তরিত করে এক্ষেত্রেও প্রতিক্রিয়া দেখানোর জন্য শিশুরা কামড় দিতে পারে।

মনোযোগ পেতে

আগেই বলেছি বাড়ন্ত শিশুদের অনুভূতি প্রকাশ করার জন্য মুখের ভাষা থাকে না। কেননা তারা কথা বলতেই শেখেনি। এ অবস্থায় পিতামাতা, অভিভাবক বা অন্য কারো মনোযোগ পেতে শিশুরা কামড় দিতে পারে।

বিরক্তি দূর করতে

শিশুদের কামড়ানোর যেসব যৌক্তিক কারণ আছে তার মধ্যে অন্যতম হলো মস্তিষ্কের চাপ এবং বিরক্তি দূর করা।

Source: Under 5s

মস্তিষ্কের চাপ এবং বিরক্তি দূর করতে শিশুরা কামড়াতে পারে। অন্য কোনো বস্তু বা মানুষকে কামড়ালে শিশু প্রফুল্ল বোধ করে।

বন্ধুকে অনুকরণ করা

শিশুরা অনুকরণ প্রিয়। তাই শিশু যদি কখনো অন্য বন্ধুকে কামড়াতে দেখে, তাহলে উৎসাহিত হয়ে সেও বন্ধুকে অনুকরণ করা শুরু করে এবং অন্যের শরীরে কামড় বসিয়ে দেয়। এমনকি অন্য কেউ তার শরীরে কামড় দিলে প্রতিউত্তর বা অনুকরণ হিসেবে সেও পাল্টা কামড় দেয়।

অনুসন্ধান করতে

শিশুর অনুসন্ধানী মন চারপাশের জগতকে আবিষ্কার করতে কামড় দিতে পারে। খাবার, নরম খেলনা, এমনকি মায়ের শরীর অনুসন্ধান করতেও শিশুরা কামড় দিতে পারে।

আত্মবিশ্বাস বাড়াতে

শিশুরা পারিপার্শ্বিক পরিবেশ দ্বারা প্রতিনিয়ত প্রভাবিত হয় এবং নিজেকে সেই পরিবেশের সাথে সম্পৃক্ত করতে চায়। যেমন বাড়িতে অন্য শিশুরা কোনো খেলার আয়োজন করলে শিশুরা সেখানে যুক্ত হতে চায়।

এ অবস্থায় নিজের আবেগ প্রকাশ করতে সে অন্যের শরীরে কামড় বসিয়ে দেয়। কেননা এই অনুভূতি প্রকাশ করার ভাষা সে জানে না। এছাড়া দলে নিজের উপস্থিতি জানান দিতেও শিশুরা বন্ধুর শরীরে কামড় বসিয়ে দেয়।

শিশুরা কী নিজের শরীর কামড়ায়?

হ্যাঁ, শিশুরা নিজের শরীরেও কামড়াতে পারে। হতাশা এবং আবেগ প্রকাশের উপায় হিসেবে শিশুরা নিজের শরীরে কামড় বসিয়ে দেয়। তবে শারীরিক এবং মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী শিশুরা অন্য শিশুর তুলনায় নিজের শরীরে বেশি কামড়ায়।

শিশুর কামড়ানোর স্বভাব কি স্বাভাবিক?

হ্যাঁ। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাড়ন্ত বয়সে শিশুর কামড়ানোর স্বভাব স্বাভাবিক এবং এটা শিশুর একটি আদর্শ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। এই স্বভাব শিশুদের মধ্যে কোনভাবেই দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

Source: Today’s Parent

তবে অভিভাবক হিসেবে শিশুর জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা আপনার দায়িত্ব। যেহেতু শিশুদের নিজস্ব বিবেচনাবোধ থাকে না, তাই কামড় দিতে গিয়ে সে বিভিন্ন জীবাণু আক্রান্ত হতে পারে।

শিশু কামড়ালে করণীয় কী?

শিশুরা ক্রমাগত এমন আচরণ করলে খারাপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। অন্য শিশু কান্নাকাটি করতে পারে। সুতরাং যত দ্রুত সম্ভব এই সমস্যার সমাধান করতে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিন এবং শিশুকে এই প্রবনতার বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করুন।

পরিস্থিতি বা ব্যক্তি থেকে দূরে সরিয়ে নিন

শিশু কামড়ালে দ্রুত তাকে উক্ত ঘটনা বা পরিস্থিতির বাইরে নিয়ে যান। তবে রাগ, চেঁচামেচি বা শিশুকে আঘাত করবেন না। যতটা সম্ভব শান্তভাবে পরিস্থিতি পরিবর্তনের চেষ্টা করুন। শিশুরা যদি বন্ধুকে কামড় দেয়, তাহলে উক্ত খেলার পরিবেশ থেকে তাকে অন্য খেলার পরিবেশে নিয়ে যান। যদি আপন ভাই বোনকে কামড় দেয়, তবে দ্রুত তাকে অন্য ঘরে নিয়ে যান।

কারণ অনুসন্ধান এবং সমাধান করুন

অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুর কামড়ানোর উপযুক্ত কারণ থাকে। সুতরাং শিশু কামড়ালে দ্রুত কারণ অনুসন্ধান করুন এবং তা সমাধানের উদ্যোগ নিন। যদি শিশু খেলনা হারিয়ে ফেলে বা অন্য কেউ তার খেলনা নিয়ে নেয়, তবে দ্রুত তার খেলনা ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করুন। অথবা যেসব সমস্যা জানান দিতে শিশুরা কামড়ের সাহায্য নেয় দ্রুত সেই সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধান করুন।

Source: Today’s Parent

আসলে শিশুর কামড়ানোর এই স্বভাব কোনো রোগ নয়, বরং বাড়ন্ত শিশুদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। শিশু তার অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে কামড়ের সাহায্য নেয়। সুতরাং এ নিয়ে বিচলিত হবার কিছু নেই। সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে শিশুর এই স্বভাব চলে যাবে। তবে তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি মোকাবেলা এবং শিশুর নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সবসময় সতর্ক থাকুন।

Feature Image: Efeu-Ev

মোস্তাফিজুর রহমান
তরুণ কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট এবং সাংবাদিক মোস্তাফিজুর রহমানের জন্ম ও বেড়ে ওঠা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলা যশোরে। পৈতৃক নিবাস যশোরের সদর থানার খোজারহাট গ্রামে। বাবা-মায়ের তিন সন্তানের মধ্যে মোস্তাফিজুর রহমান সবার বড়। লেখাপড়া করেছেন যশোরের খোজারহাট মাধ্যামিক বিদ্যালয়, ছাতিয়ানতলা চুড়ামনকাঠি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ডা: আব্দুর রাজ্জাক মিউনিসিপ্যাল কলেজ এবং ঢাকার ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে। বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনা করলেও আত্মনিয়োগ করেছেন সাহিত্য সাধনা এবং সাংবাদিকতায়। শিল্প-সাহিত্যের প্রতি তীব্র অনুরাগী মোস্তাফিজুর রহমান স্কুল জীবন থেকেই লেখালেখি করেন। বাংলাদেশ ও কলকাতার সাহিত্য পত্রিকা, দৈনিক এবং ম্যাগাজিনে লিখে থাকেন। এছাড়া জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে দৈনিক পত্রিকায় কলাম লেখেন নিয়মিত। ২০০৯ সাল থেকে সাংবাদিকতার সাথে জড়িত, একটি অনলাইন পত্রিকা সম্পাদনাসহ কাজ করেছেন বিভিন্ন পত্রিকায়। সাম্প্রতিককালে তারুণ্য, শিল্প-সাহিত্য, চলচ্চিত্র এবং ট্রেন্ডিং বিষয় নিয়ে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইউটিউবে আলোচনা করেন। ইউটিউব সহ সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মোস্তাফিজুর রহমানকে @MustafizAuthor ইউজারে খুঁজে পাওয়া যাবে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘দ্বন্দ ও পথের খেলা’ প্রকাশিত হয়।

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

More From: শিশুর যত্ন

DON'T MISS