শিশুদের নিয়মিত হোমওয়ার্কের অভ্যাস করাবেন যেভাবে


দীর্ঘ সময় ক্লাস করার পর শিশুরা স্বভাবতই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ফলে হোমওয়ার্ক বা বাড়ির কাজ করার ব্যাপারে তারা উদাসীন হয়। শিশুরা স্কুলের বাইরে দীর্ঘ সময় পড়াশোনা করতে চায় না। তারা মনে করে ক্লান্তিকর হোমওয়ার্ক তার খেলাধুলা এবং আনন্দ করার সময় নষ্ট করছে। এই কারণে তারা প্রায়ই হোমওয়ার্ক অসম্পূর্ণ রাখে। ফলে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক এবং বন্ধুদের দ্বারা লাঞ্ছিত হয়। সব মিলিয়ে তার শিক্ষাজীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ে।

Source: Phys

শিশুরা খেলাধূলা এবং আনন্দ ফূর্তি প্রিয় হয়। এছাড়া টিভি অনুষ্ঠান, ভিডিও গেম, মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, বা ইন্টারনেটের মতো আকর্ষণীয় বিষয়গুলোতে তারা মনোযোগী থাকে। তাই এইসব আনন্দময় বিষয় বাদ রেখে তারা জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে চায় না।

এ অবস্থায় পিতামাতা হিসেবে আপনার দায়িত্ব সন্তানের আদর্শ হোমওয়ার্ক রুটিন তৈরি করা এবং হোমওয়ার্ক করার ব্যাপারে তাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা। সন্তানের হোমওয়ার্ক করার অভ্যাস তৈরি করতে অনেক পিতামাতা কথা না শুনলে শাস্তি দেওয়ার পদ্ধতি অবলম্বন করে। কিন্তু শাস্তি বা শাসন কখনোই দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফল বয়ে আনে না। সুতরাং শাস্তি দেওয়ার মানসিকতা ত্যাগ করে সন্তানের আদর্শ বাড়ির কাজের রুটিন তৈরি করতে নিচে উল্লেখিত পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করুন।

স্কুলের প্রথম দিন থেকেই হোমওয়ার্ক রুটিন

বছরের শুরুতে ক্লাস শুরু হওয়ার প্রথম দিন থেকেই সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর মতো হোমওয়ার্ক রুটিন তৈরি করাও অত্যন্ত জরুরি। তাই সন্তানের হোমওয়ার্ক রুটিন তৈরি করতে বছরের শুরুতেই তৎপর হতে হবে। শুরুতেই ক্লাস পরীক্ষার তেমন কোনো চাপ থাকে না বলে সন্তানের বাড়ির কাজ করায় অমনোযোগী হওয়া যাবে না।

Source: Oxford Owl Blog

তাছাড়া প্রতিবছর শুরুতে নতুন ক্লাস, বই এবং বন্ধুদের নিয়ে শিশুরা মেতে থাকে এবং ধীরে ধীরে এ আনন্দময় পরিবেশের মধ্য দিয়ে তারা গভীর পড়াশোনার মধ্যে ডুবে যায়। সুতরাং বছরের শুরুতে তাদের এই আনন্দময় পরিবেশের সাথে নিয়মিত হোমওয়ার্ক করার রুটিন জুড়ে দিতে হবে। যেন নিয়মিত বাড়ির কাজ করার বিষয়টিও তারা আনন্দের সাথে গ্রহণ করে।

বছরের শুরুতে হোমওয়ার্ক করার অভ্যাস তৈরি করতে পারলে কয়েক মাসের মধ্যেই তারা নিয়মিত স্কুলে যাওয়ার মতো বাড়ির কাজ করার ব্যাপারেও অভ্যস্ত হয়ে পড়বে এবং শিশু নিজেই তার দৈনন্দিন কর্ম তালিকায় হোমওয়ার্ক করা গুরুত্বের সাথে স্থান দিবে।

হোমওয়ার্কের উপযুক্ত স্থান

সন্তানের হোমওয়ার্ক করার জন্য বাড়িতে একটি আরামদায়ক এবং উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করুন। অনেক শিশু তার নিজের ঘরে পড়তে ভালোবাসে। আবার অনেকে বসার ঘরে চেয়ার টেবিলে পড়তে ভালোবাসে। আবার কোনো শিশু বাড়ির বারান্দায় মেঝেতে ছড়িয়ে বসে পড়তে ভালোবাসে। শিশুর উপযুক্ত হোমওয়ার্ক করার স্থান নির্বাচন করতে তার মতামতের গুরুত্ব দিন। বাড়িতে শিশুর পছন্দনীয় স্থানে আরামদায়ক এবং নিরিবিলি পরিবেশে তাকে পড়ার এবং অন্যান্য বাড়ির কাজ করার সুযোগ করে দিন।

Source: carwad

তবে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা লক্ষ্য রাখবেন শিশুর বাড়ির কাজ করার আশপাশে যেন শোরগোল না হয়। এছাড়া শিশু চাইলে তার আরামদায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হালকা সংগীত বাজাতে পারেন।

হোমওয়ার্ক কেন্দ্র ও সরঞ্জাম

শিশুর হোমওয়ার্কের স্থান নির্বাচন করা হয়ে গেলে আপনার পরবর্তী দায়িত্ব হবে নির্বাচিত স্থানটি হোমওয়ার্ক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। অর্থাৎ হোমওয়ার্ক করতে শিশুর যেসব সরঞ্জাম প্রয়োজন হয় তা উক্ত স্থানে গুছিয়ে রাখা। যেমন : খাতা, কলম, পেন্সিল, ব, ক্যালকুলেটর, ডিকশনারি, পেপার ওয়েট, ছোট টেবিলসহ এ জাতীয় অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ।

এছাড়া সন্তানের অধ্যায়ন করা ক্লাস অনুযায়ী কম্পিউটার বা ল্যাপটপের প্রয়োজন হতে পারে। এমনকি আপনার সন্তান যদি বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন হয়ে থাকে, তবে তার ক্ষেত্রে আরো কিছু বিশেষ সরঞ্জামের প্রয়োজন হবে। এক কথায় শিশুর পড়ার এবং বাড়ির কাজ করার স্থানটি প্রয়োজনীয় সকল উপকরণ দিয়ে সাজিয়ে তুলুন, যেন সন্তান তার হোমওয়ার্ক সেন্টারে গেলে নিয়মিত বাড়ির কাজ করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।

বাড়ির কাজের সময় নির্ধারণ

বাড়ির কাজ করার জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্বাচন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা নির্দিষ্ট সময় নির্বাচন না করলে শিশুর মধ্যে নিয়মিত হওয়ার অভ্যাস তৈরি হয় না। কোনো কোনো শিশু স্কুল থেকে ফিরেই বাড়ির কাজ করতে বসে যায়। আবার কেউ কেউ কয়েক ঘণ্টা বিরতি দিয়ে বাড়ির কাজ করতে পছন্দ করে। শিশু তার বাড়ির কাজ করার জন্য কোন সময় নির্বাচন করছে সেটা মুখ্য বিষয় নয়, মুখ্য বিষয় হলো নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা।

Source: aleteia

সুতরাং আপনার সন্তানের বাড়ির কাজ করার উপযুক্ত সময় নির্বাচন করতে তার সাথে কথা বলুন এবং তার কাছে আরামদায়ক মনে হয় এমন একটি সময় নির্বাচন করুন।

তবে সাধারণত সন্ধ্যা থেকে রাতের খাবার খাওয়ার আগ পর্যন্ত হোমওয়ার্ক করার উপযুক্ত সময়। বয়স এবং শারীরিক সক্ষমতা বিবেচনায় কোনো কোনো শিশু রাতের খাবারের পরও বাড়ির কাজ করতে পারে। মোটকথা সন্তানের বাড়ির কাজ করার জন্য এমন সময় নির্বাচন করুন যাতে সে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

নিয়মিত হোমওয়ার্ক এবং বিরতি

সন্তানের নিয়মিত হোমওয়ার্ক করার অভ্যাস তৈরি করতে প্রতিদিনের রুটিন তৈরি করুন এবং তা নিয়মিত বাস্তবায়ন করতে উৎসাহিত করুন। সাথে সাথে নির্দিষ্ট সময় পরপর বিরতি নেওয়ার সুযোগ দিন।

Source: today

অনেক শিশু ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর পর বিরতি নিতে চায়। আবার কেউ কেউ একটি সম্পূর্ণ কাজ বা পড়া সম্পন্ন করে তারপর বিরতি নিতে চায়। শিশুকে তার নিজস্ব শৈলী নির্বাচন করার সুযোগ দিন, অর্থাৎ কতটা সময় পর বিরতি নেবে তা নিজেকেই নির্বাচন করার সুযোগ দিন।

এভাবে শিশুর নিয়মিত হোমওয়ার্ক করার অভ্যাস গড়ে তুলতে সার্বিক পরিবেশ নিশ্চিত করুন এবং সব সময় তার পাশে থেকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করুন।

Feature Image: Oxford Owl Blog

মোস্তাফিজুর রহমান
তরুণ কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট এবং সাংবাদিক মোস্তাফিজুর রহমানের জন্ম ও বেড়ে ওঠা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলা যশোরে। পৈতৃক নিবাস যশোরের সদর থানার খোজারহাট গ্রামে। বাবা-মায়ের তিন সন্তানের মধ্যে মোস্তাফিজুর রহমান সবার বড়। লেখাপড়া করেছেন যশোরের খোজারহাট মাধ্যামিক বিদ্যালয়, ছাতিয়ানতলা চুড়ামনকাঠি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ডা: আব্দুর রাজ্জাক মিউনিসিপ্যাল কলেজ এবং ঢাকার ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে। বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনা করলেও আত্মনিয়োগ করেছেন সাহিত্য সাধনা এবং সাংবাদিকতায়। শিল্প-সাহিত্যের প্রতি তীব্র অনুরাগী মোস্তাফিজুর রহমান স্কুল জীবন থেকেই লেখালেখি করেন। বাংলাদেশ ও কলকাতার সাহিত্য পত্রিকা, দৈনিক এবং ম্যাগাজিনে লিখে থাকেন। এছাড়া জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে দৈনিক পত্রিকায় কলাম লেখেন নিয়মিত। ২০০৯ সাল থেকে সাংবাদিকতার সাথে জড়িত, একটি অনলাইন পত্রিকা সম্পাদনাসহ কাজ করেছেন বিভিন্ন পত্রিকায়। সাম্প্রতিককালে তারুণ্য, শিল্প-সাহিত্য, চলচ্চিত্র এবং ট্রেন্ডিং বিষয় নিয়ে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইউটিউবে আলোচনা করেন। ইউটিউব সহ সকল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মোস্তাফিজুর রহমানকে @MustafizAuthor ইউজারে খুঁজে পাওয়া যাবে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘দ্বন্দ ও পথের খেলা’ প্রকাশিত হয়।

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

More From: শিশু শিক্ষা

DON'T MISS