আপনার সন্তানকে যেভাবে ইতিবাচক মনোভাবের অধিকারী করে তুলবেন


অভিভাবক হিসেবে সন্তানের প্রতি আপনার নিশ্চয় অনেক দায়িত্ব রয়েছে। সন্তানকে খুব ছোট ছোট ধারণা থেকে শুরু করে জীবন সম্পর্কিত সকল ধারণা দিতে হয় বাবা মাকে। যেন সন্তান জীবনের প্রতিটি পর্যায়ের সাথে খাপ খাইয়ে চলতে পারে। জীবনের চলার পথে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন ইতিবাচক মানসিকতা।

ইতিবাচক শিশু; Source: Baby Arabia

ইতিবাচক মানসিকতা আপনা আপনি অর্জিত হয় না। এর জন্য শিক্ষণের প্রয়োজন। শিশুরা বড়দের কাছ থেকে সব ধরণের আচরণ শেখে। কারণ তারা বড়দের অনুকরণ করতে ভালোবাসে। আপনার সন্তানকে যদি ইতিবাচক মনোভাব সম্পন্ন করে গড়ে তুলতে চান তাহলে আপনাকেও ইতিবাচক মনোভাবের অধিকারী হতে হবে।

শিশুদের ইতিবাচক করে তোলার গুরুত্ব

বড়দের মতো শিশুদেরও ইতিবাচক মানসিকতা অর্জন করার প্রয়োজন রয়েছে। ইতিবাচক মনোভাবের অধিকারী হলে জীবনে যেকোনো সমস্যা খুব সহজে সমাধান করা যায়। ইতিবাচক মনোভাবের অধিকারী হলে শিশু বড় হলে যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে ঠাণ্ডা মাথায় যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

ইতিবাচক মনোভাব শিশুদের প্রাণবন্ত ও প্রাণোচ্ছল করে। তবে অনেক শিশুর নেতিবাচক স্বভাব থাকে। শিশুর নেতিবাচক স্বভাব দূর করার জন্য কোনো চাপ প্রয়োগ না করে আপনি সুন্দর ব্যবহার দিয়ে তাকে ইতিবাচক করে তুলুন।

আপনার যেসব আচরণ শিশুকে নেতিবাচক করে তোলে

বাবা মায়ের আচরণের কারণে শিশুরা নেতিবাচক হয়ে ওঠে। বাবা মা যদি শিশুদের সাথে অতিরিক্ত রাগারাগি করে, অতিরিক্ত শাসন করে, শিশুকে অনেক বিধিনিষেধের মধ্যে রাখে, অতিরিক্ত আদরে বড় করে, শিশুকে আবেগীয় ও মনস্তাত্বিকভাবে আহত করে, বাড়ির পরিবেশ যদি বিশৃঙ্খল থাকে, শিশু সমালোচনার মধ্যে দিয়ে বড় হলে শিশু নেতিবাচক হয়ে ওঠে।

শিশুদের ইতিবাচক করে তোলার উপায়

ইতিবাচকতা শ্রেষ্ঠ হাতিয়ারের মতো। শিশুদের মাঝে ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলতে পারে বাবা মায়ের সুন্দর আচরণ। জেনে নিন শিশুদের ইতিবাচক করে তোলার উপায় সম্পর্কে।

শিশুদের আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর সুযোগ দিন

শিশুরা খুব আবেগপ্রবণ হয়। তারা খুব সহজে রাগে, খুব সামান্য কিছুতে খুশি হয় আবার অল্পতে ভয় পায়। আপনার সন্তান যদি বেশি আবেগপ্রবণ হয় তাহলে তাকে আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে দিন। তাকে আপন করে ভালোবাসুন। নিজেদের ব্যস্ততার জন্য শিশুর আবেগকে অবমূল্যায়ন করবেন না।

সন্তানের সঙ্গে আনন্দের সময়; Source: Verywell Family

এতে শিশুরা মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। রাতের বেলা দুঃস্বপ্ন দেখে শিশু প্রচণ্ড ভয় পেলে আপনি তাকে সঙ্গ দিন, তাকে সাহস দিন। কখনো শিশু কান্নায় ফেটে পড়লে তার কী হয়েছে, কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা এই সম্পর্কিত জিজ্ঞেস করুন। তাকে বোঝান ছোটখাটো সমস্যা হতেই পারে। এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়। আপনার সমর্থন ও উৎসাহ শিশুকে ইতিবাচক করে তুলবে।

আপনি মুখ্য ভূমিকা পালন করুন

শিশুরা বাবা মায়ের কাছ থেকে দেখে দেখে শিখে থাকে। আপনি যদি নেতিবাচক মানসিকতার হন, তাহলে আপনার সন্তান কখনো ইতিবাচক হবে না। আপনার সন্তানকে ইতিবাচক মনোভাবের অধিকারী করে তুলতে হলে প্রথমে আপনাকে ইতিবাচক হতে হবে। কথা, কাজে, ব্যবহারে ইতিবাচক মনোভাবের প্রকাশ ঘটাতে হবে।

উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিন

আপনার সন্তান যদি কোনো কারণে হতাশ থাকে, বিষণ্ণ ও অনুৎসাহী থাকে তাহলে তাকে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা প্রদান করুন। আপনার সমর্থন, উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা শিশুকে প্রাণোচ্ছল করে তুলবে। শিশুকে সাহসী করে তুলবে।

উৎসাহ প্রদান; Source: Care.com

সন্তানকে প্রশংসার মধ্যে দিয়ে বড় করুন। ছোট ছোট প্রাপ্তির জন্য সন্তানকে মন থেকে প্রশংসা করুন। সন্তানের ভুলের জন্য কঠোর শাস্তি দেবেন না। এতে তারা কাজের প্রতি উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। বরং কীভাবে ভুল এড়ানো যায়, কাজটি সঠিকভাবে করা যায় তা শিখিয়ে দিন।

স্বাধীনতা প্রদান

অভিভাবক হিসেবে সন্তানের প্রতি আপনার অধিকার রয়েছে। তা ঠিক। তবে অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে তাকে অতিরিক্ত বিধিনিষেধের দেয়ালে আটকে দেবেন না। তাদেরকে স্বাধীনতা দিন। নিজের মতো করে মতামত প্রদানের সুযোগ দিন। নিজের মতো রং নির্বাচন, খাবার নির্বাচন, পোশাক নির্বাচনের সুযোগ করে দিন।

শিশুর সহজাত দুষ্টুমি; Source: Positive Parenting Solutions

শিশুকে শৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে বেড়ে ওঠতে দিন। তবে অতিরিক্ত শাসনের মধ্যে দিয়ে নয়। শিশুদের নির্দিষ্ট কিছু আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, প্রত্যাশা থাকতে পারে। আপনি তাদের ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেবেন না।

সন্তানকে ইতিবাচক সঙ্গীদের সাথে মিশতে দিন

আপনার সন্তানকে ইতিবাচক বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে দিন। ইতিবাচক পরিবেশে বেড়ে উঠলে এবং ইতিবাচক বন্ধুদের সাথে মিশলে আপনার সন্তান ইতিবাচক হবে। আপনি যদি লক্ষ্য করেন সন্তান নেতিবাচক বন্ধুদের সাথে মিশছে, তাহলে সেখান থেকে বের করে আনার চেষ্টা করুন।

বন্ধুদের সঙ্গ; Source: outsmartmagazine.com

আপনার কিশোর বয়সী সন্তান বিদ্যালয়ে কার সাথে মেশে, কোথায় কোথায় যায় তা দেখার দায়িত্ব আপনার। স্বাধীনতা দিতে গিয়ে পুরোপুরি ছেড়ে দেবেন না। মাঝে মাঝে তার কাছে সবকিছু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন।

সন্তানকে মূল্যবোধ ও নৈতিকতার শিক্ষা দিন

আপনার সন্তানকে শৈশব থেকে নৈতিকতার শিক্ষা দিন। আপনার সন্তান যখন নৈতিক দিকগুলো সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করবে, তখন সে ভালো ও মন্দের পার্থক্য করতে শিখবে। সন্তানকে উত্তম মূল্যবোধ শিক্ষা দিন। তাহলে খারাপ আচরণ করতে গেলে তার বিবেক বাধা দেবে। সে খারাপ কাজ করবে না, খারাপ পথে চলবে না। বড়দের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে এবং ভালো কাজের প্রতি উৎসাহী হবে।

ইতিবাচক গল্প পড়ায় এবং সিনেমা দেখায় আগ্রহী করুন

আপনার সন্তানকে ইতিবাচক করে গড়ে তুলতে হলে তাকে ইতিবাচক গল্প পড়ার প্রতি আগ্রহী করুন এবং ভালো ভালো সিনেমা দেখায় উৎসাহিত করুন। যেসব বই ও  সিনেমা জীবন সম্পর্কে ধারণা দেয়, ইতিহাসকে জানতে সাহায্য করে, সফলতার পথে ধাবিত করে সেসব বই ও সিনেমার প্রতি উৎসাহিত করুন।

Featured Image Source: Raising Children Network

Rikta Richi

রিক্তা রিচির জন্ম ৮ ই নভেম্বর ১৯৯৫ সালে বি বাড়ীয়ার নবীনগর থানার নবীপুর গ্রামে। ছোট থেকে ঢাকায় বসবাস। ২০১০ সালে মোহাম্মদপুর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে এস এস সি এবং ২০১২ সালে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এইচ এস সি পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হোম ইকোনোমিকস কলেজের “সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও এন্ট্রাপ্রেনরশীপ” বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। রিক্তা রিচি কবিতা লিখতে ভালবাসেন। নিয়মিত লিখছেন বাংলাদেশের বিভিন্ন ম্যাগাজিন, পত্রিকা ও জাতীয় দৈনিকে এবং ভারতের বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও পত্রিকায়। ২০১৬ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ “যে চলে যাবার সে যাবেই”। ২০১৯ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ "বাতাসের বাঁশিতে মেঘের নূপুর"।

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

More From: Parenting

DON'T MISS