শিশুদের বাড়িতে সহজভাবে পড়তে শেখানোর ৭টি কৌশল


আজকের শিশুই হবে আগামী প্রজন্মের মহানায়ক। প্রত্যেকটি বাবা মায়েরই স্বপ্ন থাকে তাদের সন্তানেরা অনেক বড় হবে। শিশুদেরকে চলমান পরিস্থিতির সঙ্গে অভিযোজন করার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হচ্ছে শিক্ষা। এই শিক্ষাটাই একটি শিশু সর্বপ্রথম তার মা বাবার কাছ থেকে পেয়ে থাকে। যদিও এক্ষেত্রে মায়ের অবদান বেশি থাকে। কেননা বাংলাদেশে অধিকাংশ পরিবারই পুরুষতান্ত্রিক। এজন্যই নেপোলিয়ন বলেছেন, “আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি একটি শিক্ষিত জাতি দেবো”।

সচেতন মা বাবাই পারে শিশুকে সঠিকভাবে শিক্ষা দিতে; Source: poul Auster

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আগে শিশুদের বাসায় পড়তে শেখানো হয়। কেউ কেউ এটাকে খুব সহজ প্রক্রিয়া বলে মনে করে। কিন্ত প্রকৃতপক্ষে এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল। অনেকেই শিশু পড়তে না চাইলে প্রহার করে, কড়া শাসন করে। কিন্তু না, এটা কখনো সমাধান হতে পারে না। আপনার সন্তান কীসে আনন্দ পায় এবং কিসে বিরক্ত হয় তা আপনি জানেন। তাই আপনার সন্তানকে পড়াতে এমন কিছু টেকনিক ব্যবহার করুন যাতে সে আনন্দের সাথে শিখতে পারে। আজকে আমরা এমনই কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো:

১. খেলতে খেলতে পড়ান

শিশুদের বিনোদনের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো খেলা। খেলতে পছন্দ করে না এমন শিশু খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তাই তাদের ওপর এমন কোনো মানসিক চাপ প্রয়োগ করবেন না, যাতে তাদের খেলার প্রতি অনীহা চলে আসে। এর ফলে আপনিই লাভবান হবেন। কেননা শিশুরা খেলাচ্ছলে সবকিছুই করতে ভালোবাসে। তাই তাদের খেলাচ্ছলে কৌশলে পড়াতে হবে।

কোনো বিষয় বাস্তবিক জ্ঞান দিয়ে বুঝিয়ে দিতে হবে। একটা সময় সে পড়াশোনাকে তার খেলার মতোই মজার বিষয় মনে করবে এবং নিজের আগ্রহে পড়তে থাকবে। তাই কখনো শিশুদের প্রেসার না দিয়ে বরং খেলাচ্ছলে মুখে মুখে পড়ান।

শিশুদের খেলার ছলে শেখান; Source: Hindustan Times

তাছাড়া শিশুর জন্য এমন কিছু খেলনা নির্বাচন করুন যা দ্বারা সে কিছু শিখতে পারে। যেমন আপনি যদি আপনার সন্তানকে বিভিন্ন রঙের খেলনা কিনে দেন এবং খেলাচ্ছলে বলে দেন কোনটা কোন রং। তাহলে সে সহজেই সেই রংগুলোর নাম শিখে যাবে।

২. যেমন খুশি আঁকতে দিন

বাচ্চাদের ইচ্ছেমতো আঁকতে দিন; Source: Ministry of Education, Guyana

আপনার শিশুকে যা খুশি আঁকতে দিন। একটি শিশুর জন্য পেনসিল ধরতে পারাটাও একটা শেখার বিষয়। তাই তাদের যেমন খুশি আঁকতে দেওয়া উচিত। এই আঁকার মাধ্যমে তাকে সহজ বর্ণগুলো লিখতে সাহায্য করুন।

কোনো অবস্থাতেই ধারাবাহিকভাবে অ, আ, ই, ঈ বা ক, খ, গ নয়। যেমন সোজা দাগের মাধ্যমে শিশুকে প্রথম ‘া’ শেখাতে পারেন। দাগের সাহায্যে ত্রিভুজ আঁকা শিখিয়ে ব, র, ক লেখাতে পারেন। পর্যায়ক্রমে বাবা, কাকা ইত্যাদি শব্দ শিশুকে বানান করে শেখাতে বা লিখাতে পারেন। এভাবে আঁকার মাধ্যমেই তাকে বিভিন্ন বর্ণ ও শব্দ শেখাতে পারেন। তাই জোর করে লেখানোর প্রবণতা বন্ধ করুন। মনে রাখতে হবে, যে শিশু তার আশেপাশের যত বেশি বস্তু বা জিনিস সম্পর্কে জানবে, সে শিশু তত বেশি জ্ঞানার্জন করবে।

৩. ফোনেমিক সচেতনতা তৈরির জন্য গান ও ছড়া গল্প শেখান

বর্তমান যুগ তথ্য প্রযুক্তির যুগ। প্রযুক্তির এই যুগে বড়দের জন্য যেমন বিনোদনের ব্যবস্থা আছে, ঠিক তেমনি ছোটদের জন্যও এখন নানা রকম ছড়া, কার্টুন, গল্প তৈরি করা হচ্ছে। শিশুরা সাধারণত প্রযুক্তির মাধ্যমে শিখতে ভালোবাসে। একটি শিশুকে যখন কোনো গানের সুরে অথবা কার্টুনের মাধ্যমে কিছু শেখাবেন তখন সে তা মনযোগ দিয়ে দেখবে। কেননা সেখানে শিশুদের পছন্দ অনুযায়ী নানা কৌশলে কার্টুন তৈরি করা হয়।

Boy Studying With Home Tutor

প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিশুদের পড়ালেখায় আগ্রহী কনে তুলুন; Source: Study.com

আবার ফোনেমিক সচেতনতা হলো পড়া এবং শেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতাগুলোর মধ্যে একটি। এটি গড়ে তোলার একটি ভালো উপায় হলো একসঙ্গে তাল মিলিয়ে গান অথবা ছড়া পাঠ করা। এই কার্যকলাপটি শিশুদের জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে সাক্ষরতার দক্ষতা বিকাশের একটি দুর্দান্ত উপায়। যা সফলভাবে পড়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৪. অঙ্ক এবং টেকনিক্যাল বিষয়গুলো উদাহরণ দিয়ে শেখান

Cute little girl is drawing with pencils in preschool

শিশুদের অংক শেখার কৌশলের মাধ্যমে; Source: Scotdir.com

বেশিরভাগ শিশুরা অঙ্ক বিষয়টিকে ভয় পায়। এই ভয় একটি কৌশলের মাধ্যমে নিমিষেই দূর করতে পারেন একমাত্র আপনিই। অর্থাৎ একটি শিশুকে যদি আপনি টেকনিক্যালি কিছু শেখান তাহলে সে সেটা বেশি মনে রাখতে পারবে। তাই এক্ষেত্রে আপনি তাকে আশেপাশের বিভিন্ন জিনিসের উদাহরণ দিয়ে অঙ্ক শেখাতে পরেন। উদাহরণস্বরূপ ধরুন তার খেলনার সংখ্যা কত, তার থেকে কিছু সংখ্যক বাদ দিলে বাকি কতটুকু থাকে অথবা যোগ করলে কতটা হয় এভাবে কৌশলের মাধ্যমে অঙ্ক শিখিয়ে দিন।

তাছাড়া বড় ক্লাসের অঙ্কগুলোও বাস্তবিক উদাহরণ দিয়ে শিখিয়ে দিন। আবার বাচ্চাদের কিছু খেলনা আছে যেগুলো বিল্ডিং মেকিঙের কাজ করে যেমন : লেগো সিট। এগুলো দিয়ে আপনি প্রকৌশলের কিছু বিষয় শিখিয়ে দিতে পারেন। এতে করে তাদের ক্রিয়েটিভিটি বা সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পাবে।

৫. প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে পড়তে বসান

অনেকেই বুঝতে পারছেন না যে শিশুকে কিভাবে পড়ার প্রতি আগ্রহী করা যায়। প্রথমত এর জন্য আপনাকে একটি অভ্যাস তৈরি করতে হবে। যেমন : আমরা যখন কোনো কাজ একটি নির্দিষ্ট সময়ে নিয়মিত করতে থাকি। একটা সময় সেই কাজটা আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয় এবং প্রতিদিন সেই সময়টাতে কোনো প্রকার আলসেমি ছাড়াই সেটা করতে পারি।

ঠিক তেমনি আপনার সন্তানকে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে পড়তে বসান। তাকে এমনভাবে পড়াবেন না যাতে তার পড়ার প্রতি অনীহা সৃষ্টি হয়। সর্বোপরি, নিয়মিত পড়ার ফলে শিশুদের পড়ার প্রতি আগ্রহ ও ভালোবাসা সৃষ্টি হয়।

প্রতিদিন নির্দিষ্টি নিয়মে পড়তে বসান; Source: child Education Help

দ্বিতীয়ত, শিশুদের কখনো ধমক দিয়ে বা জোর দিয়ে পড়ানোর চেষ্টা করবেন না। কেননা এভাবে পড়ালে শিশুর পড়ার প্রতি বিরক্তি এসে যায়। তাই তাদেরকে এমন কিছু কৌশলে পড়ান যেন তারা পড়াশোনাকে এড়িয়ে না যায় বরং আগ্রহ নিয়ে পড়ে।

৬. পুরস্কার দেয়ার প্রলোভনে নয়, মজার ছলে পড়তে শেখান

অনেক বাবা মা-ই সন্তানকে পুরস্কার দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে পড়া মুখস্ত করিয়ে নেন। কিন্তু এটার একদিকে যেমন উপকারিতা আছে, অপর দিক থেকে অনেক অপকারিতাও আছে। কারণ এর মাধ্যমে বাচ্চাদের মাঝে একটা লোভ সৃষ্টি হয়। তাই তারা শুধু পুরস্কারের আশায় পড়া শিখে, কোনো রকম আগ্রহ ছাড়াই। তাই শিশুদের কোনো প্রলোভন দেখিয়ে নয় বরং বাস্তবিকভাবে মজার মধ্যমে পড়া শেখানোর চেষ্টা করুন। যেমন : কোনো গল্পের মাধ্যমে শিক্ষণীয় বিষয় ফুটিয়ে তুলতে পারেন অথবা ছবির মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানের নাম শেখাতে পারেন ইত্যাদি। এসব কৌশল প্রয়োগ করে মজার ছলে পড়া শেখালে শিশুরা পড়ার প্রতি অবশ্যই আগ্রহী হবে।

৭. উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করুন

পড়ার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তুলুন; Source: Aspire Math Academy

শিশুর লেখাপড়া শেখার ক্ষেত্রে পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিশুরা সাধারণত অনুকরণপ্রিয়। তাই তারা তাদের আশেপাশের অনেক কিছু দেখে শিখতে থাকে। শিশুর বিকাশের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে বাবা-মাকেই।

অনেক সময় দেখা যায় সন্তানকে পড়তে বলে মা নিজে টিভি দেখতে বসে যায়, যা শিশুর পড়াশোনায় অনীহার সৃষ্টি করে। শিশুর বই পড়ার সময়টা শিশুর পাশে থেকে তাকে বোঝান যে পড়ালেখার এই সময়টাকে আপনিও গুরুত্বের সঙ্গেই নিচ্ছেন। সম্ভব হলে শিশুর জন্য আলাদা একটি পড়ার রুমের ব্যবস্থা করুন। তাছাড়া শিশু যে রুমে ঘুমায়, সেই রুমের কোণায় একটি পড়ার টেবিল দিয়ে দিন। টেবিলের গায়ে শিশুর প্রিয় কার্টুন চরিত্রগুলো ব্যবহার করুন।

পরিশেষে, শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ। তাদের ভবিষ্যৎ গড়তে সর্বক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি। তাই তাদের কোমল হৃদয়টিকে আঘাত না করে বরং বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে তাদের শিখিয়ে দেওয়া উচিত। অভিভাবক, শিক্ষক, প্রতিবেশীদের যৌথ ভূমিকায় তাদের আগামীর সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

Featured Image Source: UVA Today- University of Virginia

Iffat Jahan

আমি ইফফাত জাহান। জন্ম ১৯৯৭ সালে চট্টগ্রামের একটি মফস্বল শহরে। আমার ধারণা চট্টগ্রাম বাংলাদেশের সবথেকে সুন্দর শহর। ছোটবেলা থেকেই বই পড়া আর ছবি আঁকার শখ ছিলো। বাসার দেয়ালে ছবি এঁকে ঝুলানো আর মনের মাঝে যা আসে তাই ডাইরিতে লিখাই ছিলো পছন্দের কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম। যখন একটু আধটু লিখতে পারি তখন খালামনি আমাকে একটি ডায়েরি উপহার দিয়েছিলেন। সেই সুবাদে এখনো লিখালিখি আমার প্রিয়। প্রতিটি মানুষের ভেতর কিছু সুপ্ত প্রতিভা থাকে। প্রতিভা বিকাশিত করার জন্য নির্দিষ্ট পথটি খুঁজে নিতে হয়। যার যেই কাজে প্রতিভা বেশি সে সেই বিষয়ে ভীষণ রকম ভালো পারফর্ম করে। সবশেষে, সমাজের মানুষগুলোর জন্য কিছু করার খুব ইচ্ছে। মহান আল্লাহ যদি সামর্থ দেয় ইনশাল্লাহ্ একদিন আমিও গরিব দুঃখীদের জন্য কিছু করতে পারবো।

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

More From: Parenting

DON'T MISS