শিশুকে গোসল করানোর সঠিক নিয়ম


গোসল পরিচ্ছন্নতার একটি বিশেষ অংশ। শিশুকে সুস্থ রাখতে এবং ময়লা বা ঘামের রোগ জীবাণু থেকে রক্ষা করতে গোসলের বিকল্প নেই। গোসলের মাধ্যমে শিশুকে একদিকে যেমন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা যায়, তেমনি শরীরের তাপমাত্রাও স্বাভাবিক রাখা যায়। তাই নবজাতক শিশুকে যখন থেকে গোসল করানো সম্ভব, তখন থেকেই প্রতিদিন গোসল করানোর চেষ্টা করুন। যদি শিশু সেটা পছন্দ করে।

গোসল শিশুকে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে; Source: Businessinsider.com

শিশুদের গোসল করানো নিয়ে আমাদের দেশে প্রচলিত আছে নানা ভ্রান্ত ধারণা ও কুসংস্কার। নানারকম নিয়মকানুনও চালু আছে সমাজে। এগুলো সব সময় স্বাস্থ্যসম্মত কিনা, জন্মের কত দিন পর কীভাবে গোসল করানো উচিত ইত্যাদি জেনে নেওয়া ভালো। চলুন, জেনে নেওয়া যাক শিশুদের গোসলের কয়েকটি কার্যকরী ধাপ সম্পর্কে।

১. জন্মের কতদিন পর গোসল করাবেন?

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের নবজাতক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তোফাজ্জল হোসেন খান বলেন, নবজাতকের বয়স ৩ দিন পূর্ণ হওয়ার পর গোসল করানো যায়। কোনো অবস্থাতেই এর আগে গোসল করানো ঠিক নয়। তবে এই নিয়ম শুধু পূর্ণ গর্ভকাল পেরিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুদের জন্য। যেসব শিশু পূর্ণ গর্ভকালের আগেই জন্মেছে এবং যাদের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম, তাদের ৩ দিন পরেও গোসল করানো যাবে না। পূর্ণ গর্ভকালের আগে জন্মানো শিশুদের কখন থেকে গোসল করানো শুরু করা যাবে, এটা নির্ভর করে তার ওজন এবং কতটা গর্ভকাল সে পেরিয়েছে, তার ওপর।

২. কয়দিন পর পর গোসল করাবেন?

পূর্ণ গর্ভকাল পেরোনো নবজাতক শিশুর ৩ দিন থেকে ১৫ দিন বয়স পর্যন্ত সপ্তাহে ১ দিন গোসল করানো ভালো। ১৫ দিন বয়স হয়ে গেলে গ্রীষ্মকালে তাকে প্রতিদিনই গোসল করানো যায়। তবে শিশু যদি গোসল করতে পছন্দ না করে তাহলে ১ দিন পর পর করালেও ক্ষতি নেই। কিন্তু অবশ্যই প্রতিদিন হালকা উষ্ণ পানি দিয়ে শরীর মুছে দিতে হবে। যেন ঘাম বা অন্য কোনো ময়লা শরীরে না থাকে।

পূর্ণ গর্ভকাল পার হয়নি এমন নবজাতকদের সপ্তাহে ১-২ দিন গোসল করাতে হবে। শীতকালে শিশুদের ২-১ দিন পর পর গোসল করানোই ভালো। নবজাতককে কত সময় ধরে গোসল করাতে হবে, তার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। তবে খুব বেশি সময় ধরে নবজাতককে পানিতে না রাখাই ভালো।

শিশুকে নিয়মিত গোসল করান; Source: BabyCentre

২. দিনের কোন সময় গোসল করাবেন?

সাধারণত আমাদের দেশে গোসলের জন্য সবাই দুপুরের সময়টাকেই বেছে নেয়। কিন্তু শিশুর ক্ষেত্রে যে দুপুরেই গোসল করাতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই। আপনার যদি মনে হয় নবজাতককে সুস্থ রাখতে সকাল অথবা বিকেলে গোসল করানো দরকার তাহলে তাই করুন। মোটকথা, এমন একটা সময় গোসল করান যখন আপনার শিশু গোসর করতে পছন্দ করবে। তবে মনে রাখবেন, যখন শিশু ক্ষুধার্থ থাকবে তখন কোনোভাবেই গোসল করাবেন না।

৩. কোথায় গোসল করাবেন?

নবজাতককে কোথায় গোসল করাতে হবে তার জন্য নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নির্ধারণ করতে হয় না। প্রথম অবস্থায় নবজাতককে পরিষ্কার বেসিনে গোসল করিয়ে নিতে পারেন। শিশু একটু বড় হয়ে গেলে তখন প্লাস্টিকের বালতি বা বোলে পানি নিয়ে গোসল করানো যায়।

শিশুকে টাবে গোসল করাতে পারেন; Source: YouTube

শুধুমাত্র বাথরুমে না, যে কোনো রুমে উষ্ণ, নিরাপদ এবং পরিচ্ছন্ন জায়গায় শিশুকে গোসল করাতে পারেন। শিশুর গোসলের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই ঝর্ণা ব্যবহার করবেন না। ঝর্ণা নবজাতক শিশুর জন্য খু্বই ক্ষতিকর।

৪. গোসলের পূর্ব প্রস্তুতি এবং করণীয়

শিশুকে গোসল করানোর জন্য আগে মাকে তৈরি হতে হবে এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখতে হবে, যেন যখন যেটা প্রয়োজন তা পেয়ে যান। গোসলের আগে যা যা করতে হবে :

  • প্রথমত শিশুকে গোসল করানোর আগে মায়ের হাত ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে।
  • বাচ্চার গোসলের সময় আপনাকে যাতে বিভ্রান্ত হতে না হয় সেজন্য ফোন বন্ধ রাখুন এবং আপনার হাতের ঘড়ি বা আংটি খুলে রাখুন।
  • গোসলের জন্য যা কিছু প্রয়োজন তা গুছিয়ে নিন। উদাহরণস্বরূপ তোয়ালে, লোশন, পরিষ্কার কাপড় এবং হালকা উষ্ণ পানি।

শিশুর গোসলের সরঞ্জাম গুছিয়ে নিন; Source: My Mom’s Best

  • শিশুর গোসলে সাবান ব্যবহার করবেন না। সাবানের ক্ষার শিশুর ত্বককে রুক্ষ করে দেয়। প্রয়োজনে একটি লিকুইড সাবান বা সুবাস মুক্ত তেল ব্যবহার করুন।
  • ছয় মাস বয়সের শিশুদের গোসলের জন্য ৫ সে.মি. পরিমাণ পানি ব্যবহার করুন।
  • শিশুর গোসলে ৩৭-৩৮° সেলসিয়াস তাপমাত্রার পানি ব্যবহার করুন। আপনার যদি থার্মোমিটার না থাকে তাহলে তাপমাত্রা পরীক্ষা করার জন্য আপনার কব্জি বা কনুই ব্যবহার করুন।
  • গোসলের আগে এবং পরে হালকা করে মাথায় ঠাণ্ডা পানি দিন। তবে খেয়াল রাখবেন যেন অতিরিক্ত পানি ব্যবহার না হয়।

শিশুর মাথায় পানি ঢালুন; Source: twenty20.com

৫. গোসলের সময় করণীয় পদক্ষেপ

শিশুদের গোসল করানোর ক্ষেত্রে অনেক সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। গোসলের সময় একটু এদিক সেদিক হলেই শিশুর ঠাণ্ডা লেগে যায় এবং নানা সমস্যা দেখা দেয়। তাই সাবধানে গোসল করাতে যা যা করবেন :

  • শিশুর চোখ এবং মুখ পরিষ্কার পাতলা কাপড় বা তুলো দিয়ে মুছে দিন। তুলোকে উষ্ণ পানিতে ডুবিয়ে শিশুর চোখমুখ ধুয়ে ফেলুন। খেয়াল রাখবেন যেন কান বা নাকে কিছু না যায়।
  • এক হাত দিয়ে মাথা ও ঘাড়কে ধরে, বাচ্চার মাথা ধুয়ে ফেলুন এবং তাকে শক্ত করে ধরে রেখে পানিতে বসিয়ে দিন।
  • বাচ্চাকে ধরে এমনভাবে বসান যেন কানে, নাকে পানি না ঢোকে কিন্তু তার মাথার পেছনের অংশ পানিতে থাকে। ধীরে ধীরে তার মাথার সম্মুখে পানি দিয়ে ধুয়ে দিন।
  • শিশুকে পানিতে ধরে বসিয়ে রাখুন এবং পুরো শরীর পানি দিয়ে ধীরে ধীরে পরিষ্কার করে দিন। গলার অংশে পানি দিয়ে ময়লা পরিষ্কার করে দিন।

৬. গোসলের পর কী করবেন

  • গোসলের পর শিশুকে পানি থেকে তুলে পরিষ্কার, শুষ্ক, নরম টাওয়েলের উপর রেখে দিন।
  • এরপর টাওয়েলটি দিয়ে তাকে আলতো করে মুড়িয়ে নিন, যেন শরীরের সব পানি টাওয়েলটি শুষে নেয়। গলা, কাঁধের নীচে, কানের চারপাশে ভালো করে মুছে দিন।

শিশুকে টাওয়েলে মুড়িয়ে নিন; Source: 123RF.com

  • আপনার শিশুর ত্বক যদি হয় শুষ্ক তাহলে, হালকা অলিভ অয়েল বা কাস্টারের তেলের মতো হালকা লোশন লাগাতে পারেন।
  • শিশুকে একটি নিরাপদ স্থানে রাখুন এবং পরিষ্কার কাপড় পরিয়ে দিন। শিশুর জন্য সবসময় নরম ও কোমল কাপড় ব্যবহার করবেন।
  • শিশুকে প্রতিদিন একই সময়ে এবং একই নিয়মে গোসল করানোর চেষ্টা করুন।

পরিশেষে, গোসল আমাদের প্রতিদিনকার পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই শিশুকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে গোসল করিয়ে দিন। তাছাড়া নিয়মিত গোসল করালে শিশুর রোগবালাই কম হয়। অতএব শিশুকে সুস্থ রাখতে গোসলের বিকল্প নেই।

Featured Image Source: eBay

Iffat Jahan

আমি ইফফাত জাহান। জন্ম ১৯৯৭ সালে চট্টগ্রামের একটি মফস্বল শহরে। আমার ধারণা চট্টগ্রাম বাংলাদেশের সবথেকে সুন্দর শহর। ছোটবেলা থেকেই বই পড়া আর ছবি আঁকার শখ ছিলো। বাসার দেয়ালে ছবি এঁকে ঝুলানো আর মনের মাঝে যা আসে তাই ডাইরিতে লিখাই ছিলো পছন্দের কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম। যখন একটু আধটু লিখতে পারি তখন খালামনি আমাকে একটি ডায়েরি উপহার দিয়েছিলেন। সেই সুবাদে এখনো লিখালিখি আমার প্রিয়। প্রতিটি মানুষের ভেতর কিছু সুপ্ত প্রতিভা থাকে। প্রতিভা বিকাশিত করার জন্য নির্দিষ্ট পথটি খুঁজে নিতে হয়। যার যেই কাজে প্রতিভা বেশি সে সেই বিষয়ে ভীষণ রকম ভালো পারফর্ম করে। সবশেষে, সমাজের মানুষগুলোর জন্য কিছু করার খুব ইচ্ছে। মহান আল্লাহ যদি সামর্থ দেয় ইনশাল্লাহ্ একদিন আমিও গরিব দুঃখীদের জন্য কিছু করতে পারবো।

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

More From: Parenting

DON'T MISS