গর্ভকালীন মানসিক সমস্যা ও মুক্তির উপায়


যেকোনো সন্তান প্রত্যাশী নারীর জীবনে গর্ভধারণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। গর্ভকালীন সময়ে একজন মায়ের শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি নানান রকম মানসিক পরিবর্তন দেখা দেয়। তাদের শারীরিক পরিবর্তনগুলো সবার চোখে ধরা দিলেও মানসিক পরিবর্তনগুলো অনেকাংশেই আড়ালে, অবহেলায় থেকে যায়। অথচ এসময়ের আবেগগুলোকে সঠিক সময়ে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে গর্ভাবস্থায় ও পরবর্তী সময়ে মা ও শিশুর ওপরে এর গভীর প্রভাব পড়ার আশংকা থাকে। তাই আজকের আমরা গর্ভকালীন মানসিক কিছু সমস্যা ও মুক্তির উপায় সম্পর্কে জানবো।

মানসিক সমস্যা; Source: US News Health – US News & World Report

১. মানসিকতায় আকস্মিক পরিবর্তন

গর্ভধারণ যেহেতু একটি নারীর জীবনের অনেক কঠিন একটা সময় সেহেতু এসময় মনসিকভাবে পরিবর্তন আসাটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে গর্ভধারণের শুরু ও শেষের দিকে নারীদের মন-মেজাজ অহেতুক এবং আকস্মিক পরিবর্তন হতে দেখা যায়। এ সময়ের বাড়তি শারীরিক ও মানসিক চাপ, হরমোনের তারতম্য, বিপাক ক্রিয়ার পরিবর্তন, ভয় ও দুশ্চিন্তার মতো নেতিবাচক আবেগ প্রভৃতি কারণে মেজাজ খিটখিটে হতে পারে।

গর্ভকালীন মানসিক অসুস্থতা; Source: Onlymyhealth

এ সময় মন ফুরফুরে রাখতে যা করতে পারেন-

  • এসময় অবশ্যই নিয়ম মাফিক ঘুমাতে হবে। একজন সাধারণ মানুষ থেকে একজন গর্ভবতী নারীর বেশি ঘুমাতে হয়।
  • গর্ভবতী নারীকে অনেক বেশি পরিমাণে পুষ্টিকর খাদ্য খাওয়াতে হবে। প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ি ভিটামিন খাওয়াতে হবে।
  • ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু শরীরচর্চা এবং যোগব্যায়াম করা যেতে পারে।
  • সবসময় তাদের প্রিয় কাজগুলো করলে মন ভালো থাকবে।
  • সম্পর্ককে আরো দৃঢ় করে তোলার জন্যে সঙ্গীর সাথে নিয়মিত সময় কাটানো জরুরি।

যেকোনো সমস্যা সঙ্গীর সাথে আলোচনা করুন; Source: Romper

২. ভয়

গর্ভাবস্থার মতো জটিল সময়ে মায়েদের মনে বিভিন্ন কারণে ভয় এবং উদ্বেগ দেখা দিতে পারে। যেমন সন্তান সুস্থভাবে হবে কিনা, সন্তানের কোনো জন্মগত ত্রুটি থাকবে কিনা ইত্যাদি নানা কারণে মায়ের মনে দুশ্চিন্তা থাকতে পারে। এসব ক্ষেত্রে নিজের আশঙ্কা এবং উদ্বেগের ব্যাপারে চিকিৎসকের সঙ্গে খোলাখুলিভাবে আলোচনা করতে পারেন।

বিষণ্নতা থেকে দূরে থাকুন; Source: Today’s Parent

তাছাড়া প্রসব-বেদনা নিয়ে যদি আতঙ্কে থাকেন তাহলে অবশ্যই চিকিৎসককে জানান। সে আপনাকে সম্পূর্ণ বিষয়টি বুঝিয়ে বলবে এবং অভয় দেবে। আবার অনেকের চিন্তা থাকে একজন আদর্শবান মা হতে পারবে কিনা৷ এটা সম্পূর্ণ আপনার ব্যক্তিত্বের ওপর নির্ভর করবে। নিজেকে ঠিক রাখতে পারলে অবশ্যই হতে পারবেন আদর্শ মা।

ভয় কাটাতে যা করবেন:

  • সবসময় মনে সাহস রাখার চেষ্টা করবেন। এটা ভাববেন যে এই সময় এরকম হতেই পারে।
  • বেশি ভয় হলে চিকিৎসকের সাথে সেই বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ করবেন।
  • সঙ্গীকে সব বুঝিয়ে বলবেন এবং তার দেওয়া সান্ত্বনা মন থেকে গ্রহণ করবেন।
  • কাছের মানুষদের সাথে মন খুলে কথা বলবেন।
  • যে যার ধর্মের উপাসনা করবেন এবং সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে সাহায্য চাইবেন।

৩. শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে দুশ্চিন্তা

গর্ভাবস্থার চতুর্থ মাস থেকে শেষ পর্যন্ত গর্ভবতী মায়ের পেটের স্ফীতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং শরীরের ওজন ক্রমাগত বাড়তে থাকে। সাধারণত এসব লক্ষণ সন্তান ধারণ প্রক্রিয়ারই স্বাভাবিক একটি অংশ হলেও, কোনো কোনো গর্ভবতী নারী তার বাড়ন্ত ওজন এবং সন্তান প্রসবের পর শরীরের আকৃতি পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে কিনা, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগেন। এ দুশ্চিন্তা একেবারে অমূলক নয়, কারণ অতিরিক্ত ওজন শরীরে নানাবিধ রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

ডাক্তারের পরামর্শ নিন; Source: vmmed.com

এক্ষেত্রে যেটা করতে পারেন:

  • সবসময় এটা মাথায় রাখাবেন যে এসময় ওজন বাড়াটাই খুব স্বাভাবিক। বরং ওজন না বাড়াটাই চিন্তার বিষয়।
  • দীর্ঘ নয় মাস সময় ধরে শরীরের যে ওজনবৃদ্ধি ঘটেছে, সন্তান জন্মের পর রাতারাতি সেই বাড়তি ওজন কমে যাওয়ার আশা করবেন না।
  • সন্তান প্রসবের পর দ্রুত ওজন কমানোর জন্যে হঠাৎ করে খাওয়া-দাওয়া কমিয়ে দিলে বা ভারি ব্যায়াম করা শুরু করলে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে।
  • চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্বাভাবিক ওজন ফিরিয়ে আনার একটি নিয়ম মেনে চলুন।

৪. অতিরিক্ত গোছগাছ প্রবণতা

প্রয়াই গর্ভবতী নারীদের মধ্যে এই গোছগাছ প্রবণতাটা দেখা যায়। আসন্ন নতুন অতিথির জন্য মাত্রাতিরিক্তভাবে ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা এবং বারবার সবকিছু গোছগাছ করাই এই প্রবণতার মূল লক্ষণ। কারো কারো ক্ষেত্রে এ প্রবণতা স্বাভাবিক পর্যায়ে থাকে, আবার কারো কারো ক্ষেত্রে এটি অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডারের মতো মানসিক সমস্যার পর্যায়ে চলে যেতে পারে। এ ধরনের প্রবণতা দেখা দিলে সহসাই গর্ভবতী মা ঘরের প্রতিটি অংশ নিখুঁতভাবে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে তোলার জন্যে অস্থির হয়ে ওঠেন। এমনকি রাতে হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে ঘর গোছাতে শুরু করাও অস্বাভাবিক নয়।

অতিরিক্ত গোছগাছ প্রবণতা; Source: Revere Health

গোছগাছ প্রবণতার জন্য যা করবেন:

  • যদিও গোছগাছ প্রবণতা খারাপ কিছু নয়, তবে গর্ভাবস্থায় ঘর গোছাতে গিয়ে ভারী আসবাবপত্র স্থানান্তর করা বা মই বেয়ে উঠে ওপরে কিছু পরিষ্কার করা এসব থেকে দূরে রাখতে পরিবারের সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে।
  • এই অভ্যাস যেন মাত্রা ছাড়িয়ে না যায় বা মা ও শিশুর জন্যে কোনো ক্ষতির কারণ না হয় সেদিকে মা ও পরিবারের সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।

৫. ভুলে যাওয়ার প্রবণতা

এটি গর্ভকালীন অবস্থার আরেকটি মানসিক সমস্যা। মোটামুটি সব গর্ভবতী নারীই এই সমস্যায় ভোগে। এ সময় খুব সাধারণ ব্যাপারও ভুলে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। তবে এই সমস্যাটি সাময়িক সময়ের জন্য। সন্তান জন্মের পরে স্মৃতিশক্তি পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।

ভুলে যাওয়া এড়াতে যা যা করা যেতে পারে

  • একটা নোটবই ব্যবহার করুন এবং জরুরি বিষয়গুলো নোটবইতে লিখে রাখুন।
  • স্টিকি নোটসে ছোট নোট আকারে দরকারি কাজগুলো লিখে সহজে চোখে পড়ে, এমন কোনো জায়গায় সেঁটে রাখতে পারেন।

স্টিকি নোটস ব্যবহার করুন; Source: My Little Secrets

  • ইদানিং মোবাইলসহ বিভিন্ন গ্যাজেটে রিমাইন্ডার সেট করার সুবিধা থাকে। জরুরি কাজ ভুলে যাওয়া ঠেকাতে এ সুবিধা কাজে লাগানো যেতে পারে।
  • ভুলে যাওয়ার প্রবণতার বিষয়ে খুব বেশি চিন্তিত না হয়ে বরং তা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে নেওয়ার মত মানসিকতা রাখতে হবে।
  • কোলিন এবং ওমেগা ৩ সমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণ করা উচিত। এটি গর্ভবতী মা ও তার গর্ভের সন্তান উভয়ের মস্তিষ্কের জন্যই ভালো।

পরেশেষে গর্ভাবস্থা মায়েদেন জন্য একটি নাজুক সময়। এসময় গর্ভবতীর প্রতি পরিবারের সবার যত্নশীলতা এবং পূর্ণ সমর্থন থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়কার মানসিক সমস্যাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা না হলে তা একই সঙ্গে মা ও শিশু উভয়ের জীবনেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

Featured Image Source: Fox News

Iffat Jahan

আমি ইফফাত জাহান। জন্ম ১৯৯৭ সালে চট্টগ্রামের একটি মফস্বল শহরে। আমার ধারণা চট্টগ্রাম বাংলাদেশের সবথেকে সুন্দর শহর। ছোটবেলা থেকেই বই পড়া আর ছবি আঁকার শখ ছিলো। বাসার দেয়ালে ছবি এঁকে ঝুলানো আর মনের মাঝে যা আসে তাই ডাইরিতে লিখাই ছিলো পছন্দের কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম। যখন একটু আধটু লিখতে পারি তখন খালামনি আমাকে একটি ডায়েরি উপহার দিয়েছিলেন। সেই সুবাদে এখনো লিখালিখি আমার প্রিয়। প্রতিটি মানুষের ভেতর কিছু সুপ্ত প্রতিভা থাকে। প্রতিভা বিকাশিত করার জন্য নির্দিষ্ট পথটি খুঁজে নিতে হয়। যার যেই কাজে প্রতিভা বেশি সে সেই বিষয়ে ভীষণ রকম ভালো পারফর্ম করে। সবশেষে, সমাজের মানুষগুলোর জন্য কিছু করার খুব ইচ্ছে। মহান আল্লাহ যদি সামর্থ দেয় ইনশাল্লাহ্ একদিন আমিও গরিব দুঃখীদের জন্য কিছু করতে পারবো।

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

More From: গর্ভবতী মায়ের যত্ন

DON'T MISS