তথ্য প্রযুক্তির সঙ্গে শিশুদের সম্পর্ক কেমন থাকা উচিত


বর্তমান যুগ তথ্য প্রযুক্তির যুগ। প্রতি মুহূর্তে ছোট বড় সবাই তথ্য ও প্রযুক্তির সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করছে। মোবাইল, ইন্টারনেট, ফেসবুক, গুগল, ইউটিউব ব্যবহার করে না, আজকাল এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

বড়দের পাশাপাশি ছোটরাও ডিজিটাল প্রযুক্তির সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয়ে যাচ্ছে। সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুও মোবাইলে বাজতে থাকা গান শুনে চিৎকার বন্ধ করে দেয়। অনেক শিশুরা বাবা মায়ের কথা শোনে না, ঠিকভাবে খাবার খায় না কিন্তু মোবাইলে গান ছেড়ে দিলে কিংবা কার্টুন ছেড়ে দিলে অতি দ্রুত খাবার খেয়ে ফেলে। এর ফলে দেখা যাচ্ছে শিশুরা ইন্টারনেট ও মোবাইলের প্রতি অতিমাত্রায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। যা একেবারে কাম্য নয়।

মোবাইল ফোন হাতে শিশুরা; Source: Today’s Parent

গবেষকরা মনে করেন, শিশুদেরকে অবশ্যই তথ্য প্রযুক্তির সাথে সম্পৃক্ত রাখা উচিত। কিন্তু তারা  অতিমাত্রায় যেন না ঝুঁকে পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। জেনে নিন তথ্য প্রযুক্তির সঙ্গে শিশুদের সম্পর্ক কেমন থাকা উচিত তা সম্পর্কে।

কথা বলার এইতো সময়

শিশুরাও সমাজের অংশ। শিশুদের ছাড়া কোনো উন্নয়ন ভাবার কথা চিন্তা করা যায় না। তথ্য প্রযুক্তির সাথে শিশুদের সম্পৃক্ততা থাকা উচিত। নয়তো তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে তারা মূর্খের মতো জ্ঞানহীন হয়ে বেঁচে থাকবে। তবে কথা হলো আপনি আপনার সন্তানকে প্রযুক্তির সাথে কতটা সম্পৃক্ত করবেন। প্রতিটি জিনিসের একটি সীমা বেধে দেওয়া উচিত।

ট্যাব হাতে শিশু; Source: shutterstock.com

অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো নয়। তাই সন্তান কতটা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করবে তা আপনি নির্ধারণ করে দিন। বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা, চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করা, খারাপ সময়গুলোকে কীভাবে সাহসের সঙ্গে অতিক্রম করা যায় এই বিষয়েও শিশুদের সাথে কথা বলা উচিত।

অভিভাবক হিসেবে আপনি আপনার সন্তানের সঙ্গে বন্ধুর মতো স্পষ্ট করে কথা বলুন। প্রযুক্তি ব্যবহারের উপকারিতা ও অপকারিতার কথা তাদের জানান। তারপর তাদের সিদ্ধান্ত নিতে দিন। ছোটরা সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করবে তা স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে আপনার বেধে দেওয়া সময় ও আদেশ তাদেরকে সঠিক পথে চলতে সাহায্য করবে।

তাদের গাইড হোন

ছোটরা যখন তাদের হাতের কাছে মোবাইল, ইন্টারনেট, কম্পিউটার, ট্যাব পায় তখন তারা এসব প্রযুক্তি পরিচালনায় বাবা মায়ের চেয়েও দক্ষ হয়ে ওঠে। তারা অনেক জটিল সমস্যাও মাঝে মাঝে সমাধান করে ফেলে। তাই বলে সন্তানকে কখনো অতিরিক্ত প্রযুক্তির দিকে ধাবিত হতে দেওয়া যাবে না। তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করতে গিয়ে তরুণরাও নানা ভুল করে।

গাইড হিসেবে মা; Source: Daily Mail

ফেসবুকে বিভিন্ন মানুষের সাথে যোগাযোগ করে শিশু কিশোরেরা নানান ঝামেলায় ভোগে। তাই আপনার সন্তান যখন ইন্টারনেট ব্যবহার করবে তখন আপনি তার সামনে থাকুন। আপনি তার গাইড হোন। আপনি তাকে বোঝান বাস্তব জীবন ও অযথা যোগাযোগের ভয়াবহতা সম্পর্কে আপনি তার চেয়ে ভালো জানেন। বিভিন্ন মানুষের সাথে যোগাযোগ থাকা ভালো।

তবে ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে  নানা ব্যক্তিগত তথ্যের শেয়ার অনেক সময় মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে তা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিন। আপনি যদি সন্তানের গাইড হতে পারেন তাহলে নিশ্চয় আপনার সন্তান অপ্রয়োজনে ইন্টারনেট ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করবে না এবং পড়াশুনায় মনোযোগী হবে।

মোবাইলে নানা রকম খেলা

আজকাল মোবাইল ও ইন্টারনেটের সাহায্য নানারকম খেলাধুলা করা যায়। এসব খেলাধুলার মাধ্যমে বিনোদন লাভ করা যায়। আপনি আপনার সন্তানের সঙ্গে ইন্টারনেট খেলায় অংশগ্রহণ করতে পারেন।

মোবাইলে খেলাধুলায় ব্যস্ত পরিবার; Source: Shutterstock

আপনার সন্তান যদি মোবাইল ও ইন্টারনেট নিয়ে ব্যস্ত থাকে আর আপনি যদি টেলিভিশন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন তাহলে দুজনের মধ্যে দূরত্ব বেড়ে যাবে। আপনি আপনার সন্তানের সাথে বসে খেলতে পারেন। একসাথে সময় কাটালে, খেলাধুলা করলে আন্তরিকতা বৃদ্ধি পাবে এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের উন্নতি ঘটবে।

অন্যদের কথাও শুনুন

আপনার প্রতিবেশি ও বন্ধুদের ছেলেমেয়েরা ইন্টারনেট ও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেমন ধরনের খেলা খেলে এবং সেগুলো থেকে শেখার কিছু আছে কিনা তা সম্পর্কে তাদের কাছ থেকে জানুন। নতুন ওয়েবসাইটে যদি ভালো খেলা থাকে তাহলে তা আপনার সন্তানকে জানান।

অন্যদের কথা শোনা; Source: sf.funcheap.com

সন্তানরা কী চায় তা জানার চেষ্টা করুন। খেলাধুলা করার উপকারী দিকগুলো নিয়ে তাদের সাথে আলচনা করুন। সেই সাথে অতিরিক্ত ইন্টারনেট আসক্তির কুফল সম্পর্কেও তাদের জানান। তারা যেন ইন্টারনেট ভিত্তিক খেলাধুলায় অতিরিক্ত আসক্ত না হয়ে যায় সে ব্যাপারে সতর্ক করুন।

চাই খোলামেলা আলোচনা

সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলে আপনার সন্তান কোনোদিন খারাপ পথে পা বাড়াবে না। বাবা মায়ের সাথে সন্তানের সম্পর্কের গভীরতা অনেক বেশি জরুরি। আপনি আপনার সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলুন, নানা বিষয় আলোচনা করুন।

সন্তানের সঙ্গে আলোচনা; Source: KSL 360

তথ্য প্রযুক্তির বিষয়গুলো ভালো করে বুঝিয়ে দিন। ভার্চুয়াল জীবন ও খেলাধুলার চেয়ে বাস্তব জীবন, খেলাধুলা, সম্পর্ক অনেক বেশি শক্তিশালী। তাই ভার্চুয়াল জগতের পাশাপাশি সন্তানকে বাস্তবিক শিক্ষা প্রদান করুন। মনে রাখবেন, সন্তান যদি অতিরিক্ত কম্পিউটার, মোবাইল ও ট্যাব নিয়ে ব্যস্ত থাকে তাহলে তার চোখের ক্ষতি হবে। স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটবে।

সন্তানকে বোঝানো; Source: essentialkids.com.au

ওএসবি চক্ষু হাসপাতালের চক্ষু রোগ বিশেষজ্ঞ সুস্মিতা সরকার মনে করেন, বড়দের তুলনায় ছোটদের চোখ অনেক নমনীয়। চোখে একধরনের তরল থাকে। বেশিক্ষণ বাচ্চারা মোবাইল ও কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে থাকলে সেই তরল শুকিয়ে যায় এবং এর ফলে মাথাব্যথা হয় এবং চোখের সমস্যা হয়।

তাই সন্তানকে এসব বিষয় বুঝিয়ে বলা জরুরি। তাছাড়া চিকিৎসকরা মনে করেন, প্রযুক্তি-পণ্য বন্ধ করে কখনো শিশুদের উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। বরং এর ব্যবহার ধীরে ধীরে কমাতে হবে। মোটকথা, ক্ষতিকর দিকগুলোকে এড়িয়ে প্রযুক্তিপণ্যের সাথে এগিয়ে চলতে হবে।

Featured Image Source: GeoMarketing

Rikta Richi

রিক্তা রিচির জন্ম ৮ ই নভেম্বর ১৯৯৫ সালে বি বাড়ীয়ার নবীনগর থানার নবীপুর গ্রামে। ছোট থেকে ঢাকায় বসবাস। ২০১০ সালে মোহাম্মদপুর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে এস এস সি এবং ২০১২ সালে বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এইচ এস সি পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হোম ইকোনোমিকস কলেজের “সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও এন্ট্রাপ্রেনরশীপ” বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। রিক্তা রিচি কবিতা লিখতে ভালবাসেন। নিয়মিত লিখছেন বাংলাদেশের বিভিন্ন ম্যাগাজিন, পত্রিকা ও জাতীয় দৈনিকে এবং ভারতের বিভিন্ন ম্যাগাজিন ও পত্রিকায়। ২০১৬ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ “যে চলে যাবার সে যাবেই”। ২০১৯ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ "বাতাসের বাঁশিতে মেঘের নূপুর"।

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

More From: লাইফস্টাইল

DON'T MISS