সেরেব্রাল পলসি কী? জেনে নিন এর কারণ, লক্ষণ ও প্রতিরোধ সম্পর্কে (পর্ব- ১ )


সেরেব্রাল পলসি বা সিপি নামে পরিচিত এই শব্দটি মূলত মাংসপেশী সঞ্চালনে সমস্যা বা চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী রোগকে বোঝানো হয়ে থাকে। মস্তিকের বিভিন্ন জটিলতা যেমন মস্তিকে জন্মকালীন আঘাত, জন্ম-মুহূর্তে অক্সিজেনের অভাব বা অপরিপক্ব মস্তিষ্ক ইত্যাদি নানা কারনে শিশু সেরেব্রাল পলসিতে আক্রান্ত হতে পারে।

সেরেব্রাল পলসিতে আক্রান্ত শিশু; image source: metro

সেরেব্রাল পলসির লক্ষণসমূহ শৈশবকালেই বা স্কুলগামী শিশুদের মাঝে লক্ষ্য করা যায়। অস্বাভাবিক প্রতিবর্ত ক্রিয়া (রিফ্লেক্স), হাত পায়ের মাংসোপেশি সঞ্চালনে ব্যর্থ হওয়া, শরীরের মাংসপেশী অত্যধিক নরম বা শক্ত থাকা। ঘাড় বা পশ্চাৎদেশ অতিরিক্ত শক্ত বা নরম থাকা।

শিশুর চোখের সঞ্চালনেও সমস্যা করে সিপি; image source: cparf.org

এছাড়া চোখের মাংসপেশী সঞ্চালনেও সমস্যা হয়ে থাকে। ফলে নির্দিষ্ট বস্তুতে দৃষ্টি নিবদ্ধ সমস্যার সৃষ্টি হয়। শরীর অতিরিক্ত শক্ত বা নরম থাকার ফলে এই রোগীদের শরীরের এক অঙ্গ থেকে আরেক অঙ্গের দূরত্ব বুঝতেও সমস্যায় পড়তে হয়।


খাবার গিলতে বা চিবুতে সমস্যা এই রোগের একটি লক্ষণ; image source: koreaportal.com

এই রোগের ভয়াবহতা লক্ষ্য করা যায় রোগে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির দুর্ভোগ দেখে। কেউ কেউ হাঁটতে সমর্থ হলেও বেশিরভাগ রোগী হাঁটতে অপারগ। স্বাভাবিক বুদ্ধিসম্পন্ন হতে পারে তবে বুদ্ধিহীন বা নিম্নবুদ্ধিসম্পন্ন হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায় অনেকাংশে। এতসব জটিলতার সাথে মৃগীরোগ, দৃষ্টিশক্তিহীনতা ও বধিরতা যোগ হতে পারে সেরেব্রাল পলসিতে।

লক্ষণ                          

রোগটির লক্ষণ ধরা যায় খুব সহজেই। নিবন্ধের ওপরের দিকে লক্ষণসমূহের আলোকপাত করা হলেও এবারে থাকছে বিস্তারিত। অনমনীয় মাংসপেশী যাকে স্প্যাস্টিসিটি আর স্বাভাবিকের চেয়ে নরম মাংসপেশী যাকে রিজিডিটি বলা হয়।

মাংসপেশি ও চলাচলের গতিতে সমন্বয় সাধনের অভাবকে বলে এটাক্সিয়া। মটর স্কিল বা সঞ্চালনে দেরী হওয়া বা অক্ষমতা। যেমন : হাত দিয়ে বস্তু ধরা, ধাক্কা দেয়া। একা একা বসতে পারা বা হামাগুঁড়ি দিতে ব্যর্থ হওয়া। শরীরের যেকোনো একপার্শ্ব ব্যবহারে অধিক স্বাচ্ছন্দ্য প্রকাশ করা। শুধুমাত্র বাম বা ডান দিকের হাত পা ব্যবহার করা।

বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিচ্ছে শিশু; image source: nursingcrib.org

হাঁটতে অসমর্থ হওয়া। গোঁড়ালিতে ভর দিয়ে হাঁটা। দুই পা ক্রস চিহ্নের আদলে রাখা। হাঁটু ভাজ করা অবস্থায় ক্রস চিহ্নের মতো রাখা। দেরিতে কথা বলা বা কথা বলতে না পারা।

সিপি আক্রান্ত শিশুর শারীরিক কিছু লক্ষণ; image source: slideshare.net

অতিরিক্ত লালা নিঃস্বরণ ও গিলতে সমস্যা হওয়া। খাবার গ্রহণে ও চুষে খেতে পারে না।

মস্তিষ্কের যে অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় সে অনুযায়ী শরীরের বিভিন্ন অংশ তার কার্যকারিতা হারাতে পারে। কখনো পুরো শরীরই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বা কোনো বিশেষ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ব্রেইন ডিজওর্ডার, যে কারণে সিপিতে আক্রান্ত হবার আশঙ্কা থাকে সেটি এককালীন। সময়ের সাথে সাথে এই ডিসঅর্ডার ছড়িয়ে যায় না বা বেড়ে যায় না। তবে উপযুক্ত সাহায্যের অভাবে রোগের ক্ষতির আশংকা বেড়ে যায়।

সিপির লক্ষণসমূহের সাথে মুখে ঘা, মূত্রনিঃস্বরণ স্বাভাবিক না থাকা, খিঁচুনি ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

কারণ সমূহ

সেরেব্রাল পলসিতে আক্রান্ত হবার প্রধান কারণ এখনো অজানা। তবে মস্তিষ্কে অস্বাভাবিকতা বা আঘাতপ্রাপ্তিকে একটি অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হয়। যা গর্ভে থাকাকালীন বা প্রসবকালীন কোনো আঘাতের কারণে বা দূর্ঘটনার কারণে হতে পারে। আরো কিছু কারণ আলোচনা করা হলো।

একনজরে সেরেব্রাল পলসির কারণসমূহ; image source: verywell health

জিনগত কারণে বা মাতৃত্বকালীন ইনফেকশনের কারণে শিশুর মস্তিস্কের গঠন বিকৃত হতে পারে বা মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। যার ফলে শিশু সেরেব্রাল পলসিতে আক্রান্ত হতে পারে। ফেটাল স্ট্রোকের কারনে গর্ভে ফেটাসের মস্তিষ্কে রক্ত ও অক্সিজেন চলাচলে ব্যাঘাত হলে সিপি হবার আশংকা থেকে যায়।

শিশুর কোনো ইনফেকশনের কারণে শিশুর মস্তিষ্কে প্রদাহের সৃষ্টি করতে পারে। এই প্রদাহ থেকে শিশু এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। শিশু বেশ বড়সড় কোনো দূর্ঘটনায় পতিত হলে এবং মাথায় আঘাত পেলে। তাছাড়া জন্মের সময় অক্সিজেনের অভাব হলে তা মস্তিষ্কের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে, যা সেরিব্রাল পলসিতে আক্রান্ত হবার অন্যতম কারণ।

সেরেব্রাল পলসিতে আক্রান্ত হবার ঝুঁকিসমূহ

মায়ের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে    

জার্মান মিজেলস (রুবেলা), চিকেন পক্স, সাইটোম্যাগালো ভাইরাস, হার্পস, জিকাভাইরাস, টোক্সোপ্লাসমোসিস, থাইরয়েড  ইত্যাদি ইনফেকশন বা রোগ গর্ভবতী মায়ের শরীরে উপস্থিত থাকলে তা শিশুর সিপিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিকে বাড়িয়ে তোলে।

শিশুর স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে

ব্যাক্টেরিয়াল ম্যানিনজাইটিস ও ভাইরাল এনসেফালিটিস : ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন শিশুর মাথার কোষ পর্দায় ও স্পাইনাল কর্ডে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। যার দরুণ সেরেব্রাল পলসিতে আক্রান্ত হতে পারে। তীব্র জন্ডিস হলে এবং তার চিকিৎসা করা না হলে শিশু এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

এছাড়া আরো কিছু উপাদান যা সিপির ঝুঁকিকে বাড়িয়ে তোলে সেগুলো হলো :

  • ব্রিচ বার্থ ( প্রসবের সময় ফেটাসের মাথা ব্যাতীত অন্য অঙ্গ আগে বেরিয়ে এলে)।
  • প্রসবে জটিলতা যেমন : শিশু পর্যাপ্ত অক্সিজেন না পেলে বা শ্বাসকষ্ট শুরু হলে।
  • শিশুর ওজন ২.৫০ গ্রামের কম হলে।
  • গর্ভে যমজ ফেটাসের অবস্থান ও যেকোনো একটি ফেটাসের মৃত্যু হলে অপরজনের সিপির ঝুঁকি অনেকাংশে বেড়ে যায়।
  • অপরিপক্ব সন্তান জন্ম নিলে। অর্থাৎ, ৩৭ সপ্তাহের পূর্বে সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে।
  • মায়ের ও সন্তানের রক্তে আর এইচ ফ্যাক্টর উপস্থিত থাকলে।

প্রতিরোধ ব্যবস্থা

সেরেব্রাল পলসি প্রতিরোধের বিশেষ কোনো উপায় নেই। তবে কিছু বিষয়ে সতর্কতা সিপির ঝুঁকিকে লাঘব করতে সক্ষম।

টিকা নেয়া

রুবেলা, চিকেনপক্সসহ আরো কিছু রোগের টিকা নেয়ার মাধ্যমে এর ঝুঁকি কিছুটা প্রশমন করা সম্ভম।

স্বাস্থ্য সচেতন হওয়া

স্বাভাবিক সময়ের সাথে সাথে বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় স্বাস্থ্য সচেতনতা ও নিজের প্রতি যত্নশীলতা অনেক রোগের হাত থেকে সহজেই মুক্ত রাখতে পারে। প্রসব পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে নিয়মিত বিষেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ ও যেকোনো জটিলতায় দেরি না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মেনে চলতে হবে।

এছাড়া গর্ভকালীন সম্পূর্ণ সময়টাতে কোনো প্রকার আঘাত বা দূর্ঘটনা যেন না ঘটে সে ব্যাপারে সচেতনতা বজায় রাখতে হবে। গাড়িতে অবস্থানকালে সিট বেল্ট পরিধান করা, সিঁড়িতে চলাচলে সতর্ক থাকা ইত্যাদি বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

ফিচার ইমেজঃ cerebralpalsyguidance.com

Comments 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

More From: শিশুর যত্ন

DON'T MISS